মাছের বাজার

একঃ
মেসে থাকার একটা কষ্ট আছে; ক্লাস করতে হয়, পড়তে হয়, কাপড় কাচতে হয়, বাজার করতে হয়, মাঝেমধ্যে রান্না করে খেতে হয়। আবার আছে রুমের অন্যান্য সদস্যদের মন মতো বাজার করার রেওয়াজ।
বেশি দামে কেনা যাবে না, বেশি পরিমানে কেনা যাবে না, বাজারের সেরাটা কিনতে হবে- ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি রান্না করা শিখেছি মেসে। বুয়া না থাকলে রান্না করতে হয়, প্রথম প্রথম ভালো হত না, এখন হয়। একজন তো মেসে রান্না শিখেই বিরাট বাবুর্চি বনে গেছে! এলাকায় তার বেশ নাম ডাক।
যাক সেসব কথা, বাজার করতে এসেছি আগে বাজার করি।
বেশকিছু দিন যাবত বাজার চড়া। বারবার দাম নির্ধারন করা সত্ত্বেও বাজার নিয়ন্ত্রনে আসছে না। বাজার পরিদর্শকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। মানুষ যদি শোনে নদীর মাছ, তাহলে আর কিছু করতে হবে না,ক্রেতারাই মাছের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দেয়।
আজকে অবশ্য নদীর মাছ আসেনি, কিন্তু তারপরেও আজ মাছের গায়ে আগুন, হাত দিলেই ফোস্কা নিশ্চিত!
পুরান ঢাকার মাছের বাজারগুলো সাধারণত খুব নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত। যায়গায় যায়গায় গোড়ালি সমান কাদা পানি। সেই পানিতে মাছ সাতার কাটে না, সাতার কাটে মানুষ!
একজন বৃদ্ধকে দেখলাম পায়জামা হাটু পর্যন্ত গুটিয়ে একটা রুই মাছ দাম করছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ঐ মাছের দাম হবে চারশো টাকার মতো কিন্তু বিক্রেতা চাইছে চৌদ্দশ টাকা! বৃদ্ধও কম যায় না, সে আড়াইশ টাকা থেকে শুরু করেছে! দরকষাকষি আমাদের সমাজের সর্বক্ষেত্রের একটা প্রচলিত রীতি। আমি মুচকি হেসে মুরগির দোকানের দিকে চললাম, মাছ খাওয়ার চাইতে এই মুহুর্তে মুরগির মাংস খাওয়া নিরাপদ!

দুইঃ
আজ আমার ভাইবা, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে এসেছি, নামকরা কিছু না। নামকরা কোম্পানিতে চাকরী করবে গল্প নাটকের হিরোরা- আমি না।
চাকরী নামক কর্মে আমার একটু চুলকানি আছে। জানি অপ্রাসঙ্গিক, তারপরেও দুটো কথা না বলে পারছি না।
"তৃতীয় শ্রেনী" নামে চাকরী ক্ষেত্রে একটা পদ সৃষ্টি করা হয়েছে; যা ইংরেজিতে রুপান্তর করলে গালি আর বাংলায় বললে কর্মচারী! বিশ্বাস না হয় তৃতীয় শ্রেনীর কোন কর্মকর্তাকে Third person বলে দেখুন কি হয়! আজব দুনিয়া।
ঘুষ দেয়া নেয়া সম্পর্কে নাই- বা বললাম, বলা বারণ আছে, তাতে আপনারও লস, যে খাবে তারও পেট খারাপ। তাই লস বা পেট খারাপ না করে ট্রাই করছি তো করছিই- পুরোপুরি বাধ্য হয়ে।

ভাইবা রুমে বসে আছি, একজন ভেতরে আছে, আমি বসে আছি আরেকজনের সাথে।
অস্বস্তি লাগা উচিৎ ছিল কিন্তু লাগছে না। প্রাইভেট কোম্পানিতে সাধারণত সরকারী চাকরীর ভাইবার মতো গুরুগম্ভীর প্রকৃতির সবজান্তা শমসের টাইপের লোক থাকে না। সবাই চটপটে আর খোশ মেজাজে থাকে। সরকারী কর্মকর্তারা এক কথা দুই বার বললেই রেগে যায়, এখানে এক কথা দুইবার কেন হাজার বার বললেও সেই সুযোগ নেই। প্রাইভেট কোম্পানিতে আরেকটা সুবিধা আছে, আপনার নিজের মতামত দেয়ার সুযোগ আছে।
সব দিক চিন্তা করেই মনে হয় অতোটা অস্থিরতা টের পাচ্ছি না। নাকি এসব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি তাও বুঝতে পারছি না!আসলে কিছুই হবে না, কিছু একটা করা দরকার তাই ব্যস্ততার ভান করছি এই যা!

নিয়োগদানের জন্য কোন বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি, তার আগেই শতশত আবেদন জমা পরেছে। যতটুকু যেনেছি পোষ্ট ভাল, বেতন আলোচনা সাপেক্ষে হলেও বেশ কম। টাকার জন্যই যেহেতু চাকরী করবো তাই মেধার কথা বলে হা-হুতাশ করে লাভ নেই। এখানে মেধার কথা বলা মানে মেধাকে সস্তা করে ফেলা আর নিজেকে দুর্বল বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া। দেশে এখন মেধাবীদের শীর্ষে তারাই যারা "এ+" পায়; আর যারা বেশি টাকা বেতনের চাকরী করে। দেশে মেধাবী মানুষের অভাব নেই, এখন অভাব মেধাহীন মানুষের। মেধাহীন মানুষ বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায়!

ভেতরে গেলাম, একজন মাত্র ব্যক্তি বসে আছে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন, সাহস বেড়ে গেল।
আমাদের দেশে এখনো অনেক যায়গায় স্যার টাইপের লোক; বিশেষ করে অফিসের স্যারদের সাথে হ্যান্ডশেক করা মানে বেয়াদবি। যাহোক তিনি ভালো আছি কিনা তাও জিজ্ঞেস করলেন। খুব ভালো লাগলো। ভাইবাতে ইতিবাচক কিছু মানেই সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছানো।

কর্তার সাথে কী কী কথা হয়েছে সেসব বলার মতো তেমন কিছু না। আর দশটা স্বাভাবিক ভাইবার মতো এটাও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু শেষ প্রশ্নে নিজেকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে!

কর্তা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরী করবেন?"
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, বলে কি এই উজবুক! আমি অনার্স পাশ, তার থেকেও বড় কথা এখানে একজন সাধারন শ্রমিকের বেতন প্রায় আট হাজার টাকা। তাহলে আমার নামের পিছনে অফিসার লেবেল লাগানোর দরকার কী?

আমার সাহস এমনিতেই বাড়া, তার উপর রাগ চড়ে গেলে সাহস জ্যামিতিক হারে বাড়ে। তাই কোন দিকে না তাকিয়ে প্রশ্ন করে করে বসলাম,
"কী বলছেন এসব, একজন চা বিক্রেতার মাসিক ইনকামই তো বারো হাজার টাকার উপরে!"
তিনি হাসি মুখে বললেন," তাহলে তো চায়ের দোকান দেয়াই ভালো, কী বলেন?"
আমি বললাম, "সরকারী বিধি মোতাবেক এতো কম বেতন তো দেশের কোথাও থাকার কথা না, তাহলে আপনারা এতো কম বলছেন কেন?"
"আপনার থেকেও বেশি শিক্ষিত লোক এই বেতনে চাকরী করার জন্য দরজার ওপাশেই অপেক্ষা করছে, তাই।"-লোকটার সোজা উত্তর।
আবার সেই দরকষাকষি! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস