দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

                        মোঃসিফাত হোসেন

দর্শনের ছাত্র হওয়ার কারনে আমার অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে,এখনো হচ্ছে।সামনে, পেছনে অনেক কথাই শুনেছি।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের এক ছাত্র আমাকে বলেছিল দর্শন নাকি লোকাল সাবজেক্ট।আমি তাকে বেয়াকুফের মতো জিজ্ঞেস করেছিলাম,"ভাই,তাহলে সিটিং সার্ভিস সাবজেক্ট কোনগুলো?”

আমি ভেবে পাইনা সাবজেক্ট আবার লোকাল হয় কি করে?লোকাল তো হয় শুনেছি বাস, ট্রেন,জাহাজ।উন্নত দেশে এগুলোও লোকাল হয় না।আমি সেদিন অপমানিত না হয়ে হয়েছিলাম বোকা।
অনেকে আবার সরাসরিও বলেছে,"ও দর্শনে পড়,আর কিছু পাওয়া গেল না,এইটা একটা পড়ার বিষয় হইল,বাজারে তো এর কোন মূল্যই নাই।আকাঠ মূর্খ না হলে এখন আর এসব কেউ পড়ে নাকি!"
অতিব জ্ঞানের কথা,"বাজারে মূল্য নাই।"তাহলে আমি কেন পড়ছি?

সমালোচনা শুনে আগে মনে মনে হাসতাম,এখন প্রকাশ্যেই হাসি।কেননা,দর্শন সবার জন্য নয়।
সমালোচকরা দর্শন সম্পর্কে কিছুই জানেনা।প্রায় প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষই বাংলা,ইতিহাস,বিজ্ঞান,ইসলাম শিক্ষা,সমাজ কল্যান,সমাজ কর্ম,রাষ্ট্র বিজ্ঞান ইত্যাদি কী; সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা রাখে,কিছুনা কিছু বলতেও পারে কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা কেউ "দর্শন কী"এর উত্তর জানাতো দূরে থাক, দর্শনের অর্থই বলতে পারেননি,একজনও বলতে পারেনি।কিন্তু প্রত্যেকেই সমালোচনা করেছে, সমালোচনা করতে তারা বড়ই ওস্তাদ। তারা জানতে পর্যন্ত চায়নি ;বিষয়টা আসলে কি,কিসের সমালোচনা করছি?সমালোচা আর জ্ঞান এই দুইটা জিনিশ আমাদের দেশে বিনামূল্যে সবখানে পাওয়া যায়।

যত সমালোচনাই হোক না কেন ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন কথা বলে।একটা সময় বিজ্ঞান বলে কিছু ছিল না,তখন দর্শন ছিল বিরাট ব্যাপার।দার্শনিকদের তখন খুবই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ বলে মনে করা হত,মানুষ তাদের মূল্যায়ন করতো, সম্মান দিত।এর কারনও আছে।তারা জ্ঞানবিদ্যা নিয়ে আলোচা করতো।নীতি বিদ্যাকে শাস্ত্রে রুপান্তর করেছিল,পৃথিবী সৃষ্টির মৌলিক প্রশ্নের যৌক্তিক আলোচনা দার্শনিকরাই প্রথম করেছিল,এমনকি বিজ্ঞানের অনেক মৌলিক বিষয় দর্শন তৈরি করে দিয়েছিল।যেমন অনু পরমানুর ধারনা। তখন পদার্থ বিদ্যাকে প্রকৃতি বিষয়ক দর্শন বলা হত।
এখন অবশ্য এর কোন মূল্য নেই!কারনটা বাজার দর!
যুক্তিবিদ্যা ও কার্যকারন ছাড়া পৃথিবীর অনেক কিছুই অচল।আইন যুক্তিবিদ্যা ছাড়া চলতে পারে না,বিজ্ঞান কার্যকারন ছাড়া চলতে পারে না,কিন্তু যুক্তিবিদ্যা ও কার্যকারন যে দর্শন এটাই তারা স্বীকার করতে চায় না।এটা অনেকটা নিজের জনককে অস্বীকার করার মত।বৃদ্ধ বাবা মাকে অস্বীকার করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়ার মত ঘটনা।"তোমাদের আর দরকার নেই,আমরা এখন হাটতে শিখেছি।"

বর্তমানে দর্শনের "অবস্থা কী"এ সম্পর্কে একটা উদাহরণ  দেই,তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা খুব জ্ঞানী ও হাসিখুশি মানুষ ছিলেন।একবার এক কৃষক মোল্লা সাহেবের কাছে আসলেন কিছু জ্ঞান অর্জনের আশায়,তিনি এসেই দেখলেন মোল্লা সাহেব দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিচ্ছেন।লোকটি জিজ্ঞেস করলো,"আপনি কী করছেন?"
মোল্লাঃহাত গরম করছি।
লোকটা খুশি হল,যাক কিছু শিখতে পারলাম।এমন সময় মোল্লার বউ একবাটি গরম ঝোল নিয়ে আসলো, মোল্লা বাটি হাতে নিয়ে ফুঁ দিলেন।
লোকটি জিজ্ঞেস করলো, "আপনি কী করছেন?"
মোল্লাঃখাবার ঠাণ্ডা করছি।
লোকটা চলে গেল এটা ভাবতে ভাবতে যে,যে লোক একবার ফুঁ দিয়ে হাত গরম করে আবার একই ভাবে ফুঁ দিয়ে খাবার ঠাণ্ডা করে তার কাছে আর যাই হোক শেখার মত কিছু নাই!

মোল্লা সাহেবের দর্শন আমরা বুঝতে পারিনাই,তাই বলে সমালোচনা করতে পারবোনা?আলবৎ করতে পারবো,ওটাই আমরা সবচাইতে ভাল পারি!সমালোচনা আমিই করে দিচ্ছি,"মোল্লা সাহেব পাগল!"

মন্তব্যসমূহ

  1. মোল্লা সাহেবের দর্শন আমরা বুঝতে পারিনাই,তাই বলে সমালোচনা করতে পারবোনা?আলবৎ করতে পারবো,ওটাই আমরা সবচাইতে ভাল পারি!সমালোচনা আমিই করে দিচ্ছি,"মোল্লা সাহেব পাগল!"

    উত্তরমুছুন
  2. আমি মোল্লা সাহেব হতে চাই না,আমি চাই মোল্লা সাহেবের দর্শন

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

বাঘা বাতাস