মশা

বাশখালী গ্রামের আছিম নিয়া বিমর্ষ মুখে উঠানের মাঝখানে চেয়ার পেতে বসে আছেন। তার কান্না পাচ্ছে না তবে বেশ রাগ হচ্ছে। রাগের মাত্রা থার্মোমিটারে একশ সাত।

আছিম মিয়া আর যাইহোক খারাপ মানুষ অন্তত নন। তিনি সহজ সরল মানুষ। কিন্তু রেগে গেলে তার সাতাশি কেজির দেহটি কেপে ওঠে থর থর করে! আজ তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে বারবার।

সাঙ্গপাঙ্গরা ভয়ের চোটে মুখে আঙ্গুল দিয়ে তারই পিছনে চুপ করে তারকাটার মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার খাবার- দাবার বন্ধ গত রাত থেকে। যে কেউ দেখলে বলবে প্রাইমারী স্কুলের গনিতের শিক্ষক ছাত্রদের শাস্তি দিচ্ছেন।  আছিম মিয়া ভাবনারই কূলকিনারা খুজে পাচ্ছেন না, সমাধান পাবে কী? তিনি শুধু একটা কথাই ঘুরেফিরে ভাবছেন; এতো জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কেউ নির্বাচনে ফেল করেছে কি না!

হ্যা, এটাই তার আনলিমিটেড রাগের কারন। তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচনে ফেল করেছেন- বিশাল ব্যবধানে। কানে একটু কম শুনলেও আছিম মিয়া চোখে দেখেন ঠিকমতো। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন জনসভার লোকজন। যে পরিমান লোকের হাততালি তিনি পেয়েছেন তা আজ পর্যন্ত এই ইউনিয়নে কোন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী পায়নি। কথায় কথায় হাততালি, দম ফেলার আগেই হাততালি, ডানে বায়ে তাকানোর আগে হাততালি! এমন জনপ্রিয়তা আছে কারো! তারপরেও কীভাবে সম্ভব এতো বিরাট ব্যবধানে ফেল! একথা তিনি ভাবছেন আর কপাল চাপড়াচ্ছেন।

সাত সকালেই হুকুম জারি করেছেন,"যেভাবে পারস খবর নে, ক্যাডা কইছে মাইনষ্যে আমারে ভোট দেয় নাই? বেবাকে ভোট দিছে, হাততালি দিয়া সমর্থন দিছে, তাইলে ফেল করলাম ক্যামনে?"
আছিম মিয়ার গর্জনের সামনে কেউ শব্দ করতে পারছে না, সুবিধাবাদীরা আগেই পালিয়েছে।
তিনি বলে যাচ্ছেন,"নির্বাচনে জালিয়াতি হইছে?"
"না হয় নাই"-পেছন থেকে কে যেন বলল।
"তাইলে ফেল করলাম ক্যামনে?" বাজখাঁই  গলার আওয়াজে গমগম করে উঠলো পুরো বাড়ী, টিনের চালে শব্দ হলো ঝনঝন!
তিনি গর্জন চালিয়ে যাচ্ছেন," আবার খোজ নে, ভাল কইরা খোজ নে, কার সমাবেশে লোক বেশি হইছিল।"

এমন সময় আছিম মিয়ার প্রচার সম্পাদক মুক্তার মিয়ার দৌড় বিশিষ্ট আগমন। তিনি হাপাতে হাপাতে বললেন, "পাইছি চাচা, কারন পাইছি, আফনের ফেল করার কারন পাইছি।"
আছিম মিয়া তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললেন, "ক, তাড়াতাড়ি ক, ক্যামনে ফেল করছি?"
মুক্তারঃ চাচা, আগেই কইছি আফনের সমাবেশেই সব চাইতে বেশি লোক হইছিল, হাততালিও দিছে সবার চাইতে বেশি। বিশ্বাস তো করলেন না। তাই আবারো রহিম বক্সের পোলা, ঐ যে কলেজে পড়ে ওর মোবাইলে সব নেতাগো ভিডিও দেখছি, আফনের লোকই বেশি ।
আছিম মিয়াঃ গান গাওয়া বন্ধ করবি, না ডান্ডার বারী খাবি? তাড়াতাড়ি আসল কারন ক।"
মুক্তারঃ চাচা, আফনের ফেল করার আসল কারন; আফনে যেইখানে সমাবেশ করছেন সেইখানে মশা আছিল মাইনষ্যের চাইতে বেশি! চাচা, কেউ হাততালি দেয় নাই, বেবাকে মশা মারছে!

মুক্তার মিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই আছিম মিয়া উল্টো দিকে দৌড় দিয়েছিলেন এখন ফিরে আসছেন হাতে ইয়া বড় এক মুগুর নিয়ে। মুক্তার মিয়া খেয়াল করেনি তার চাচার কানের এমপ্লিফায়ার মেশিনটা অনেক আগেই খুলে গেছে, তিনি কী শুনেছেন আল্লাহ মালুম! অবস্থা বেগতিক, পুরো পাহাড় ছুটে আসছে তার দিকে। পেছনের লোকজন মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেছে। সাত মাত্রার ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। মুক্তার মিয়া এক্ষুনি দৌড় না দিলে মুগুরের এক  বারীতে মারা না গেলেও ভূমিধ্বসে মারা যাবে নির্ঘাত!

আছিম মিয়া দম বড় করে মুক্তারের পিছনে লাঠি হাতে ছুটতে ছুটতেই বলছেন,"তরেরেরে খাইইইইছি, আইজ তরে দিয়াই নাস্তা করুম! হারামজাদা আমারে মশা কস! এতো বড় মশা দেখছস দুনিয়ার কোনহানে!"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস