ভয়!
প্রথম খন্ডঃ
ভয় একটা রোগ,রোগের সঠিক চিকিৎসা করাতে হয়।তা না হলে রোগ বাড়ে। রোগ বাড়তে দিলে তা ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে।ভয়ে কারো ক্যন্সার হয়না ঠিকই তবে প্রচণ্ড ভয় পেলে মানুষ মারা যায়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভয় নামক জিনিসটার কোন স্বাভাবিক চিকিৎসা আমাদের দেশে হয় না।একজন মনোবিদ্যা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চাইতে আমাদের দেশের মানুষ কবিরাজের কাছে যেতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে।এতে টাকাও কম লাগে আবার অনেকের নাকি কাজও হয়!
আমি এসব কবিরাজি বিশ্বাস করি না,তবে এতে আমার আগ্রহ আছে!কবিরাজরা কি করে,কিভাবে করে;এসব দেখে আমি বেশ মজা পাই।
একদিন ঘটনাক্রমে আমাদের বাড়িতেই কবিরাজের আগমন ঘটলো।অসুস্থ আমার মা।তার মাথা ব্যথা;প্রচণ্ড ব্যথা।ব্যথা শুরু হলেই মা কীসব যেন দেখে আর ভয়ে কুকড়ে যায়।ডাক্তার দেখাতে দেখাতে মা বিরক্ত হয়ে গেছে।পছন্দ না হলেও মাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য কবিরাজ আমি নিজেই ডেকে এনেছি।এতে যদি মা-র মানসিক প্রশান্তি হয় তবে আমার আর সমস্যা কোথায়!
কবিরাজ সম্পর্কে আমার দূরসম্পর্কের দাদা হয়।
দাদার বয়স কত হবে তা আন্দাজ করা বেশ মুশকিল।তবে নব্বইয়ের কম কোনক্রমেই হবে না।গালের চামড়া কোঁচকানো,গায়ের রঙ অদ্ভুত কালো।অদ্ভুত কালো বলছি কারন দিনের বেলা তাকে স্বাভাবিক কালো বলেই মনে হয় কিন্তু রাতের বেলা চকচকে কালো মনে হয়!
অনেকে বলে দিনের বেলা সে মানুষ আর রাতের বেলা শয়তান হয়ে যায়।এই কথা প্রমাণ করতেই কিনা কে জানে, পুরু গোফ তাকে আরো ভয়ংকর করে তুলেছে।চোখ দুটো রাতে ভাটার মতো জ্বলজ্বল করে আর দিনের বেলা জবা ফুলের মতো লাল!
তিনি কোন দিন নেশা করেননি,তারপরেও মনে হয় ঘোর নেশাগ্রস্ত।এই ধারনা কেটে যায় যখন সে কথা বলে।আশ্চর্যরকম শান্ত আর সরল কথা।
তার কাজেও একটা সরলতা আছে,একটা ধারাও আছে।অমাবস্যার রাত ব্যতীত তিনি কাজ করেন না,আর কাজটা করেন রাত ঠিক বারোটার সময়।এখন রাত ঠিক এগারোটা পঞ্চান্ন।আসল কাজ শুরু হবে এখন থেকে ঠিক পাঁচ মিনিট পরে।আজকের আকাশে কোন তারা নেই।
আমিআগেও খেয়াল করেছি দাদার হাতে কোন ঘড়ি না থাকলেও,উনি কীভাবে যেন সঠিক সময় বের করে নেন।
এখনো তাই করলেন।
আমি তার কথা মতো জবা ফুল,শুকনো পাট খড়ি, একটা নতুন মাটির ঢাকনা একটা নতুন চুলা, একখণ্ড কাগজ আর একটা নতুন কলম জোগাড় করেছি।জবা ফুলের কোন কাজ নেই,কিন্তু জবা ফুল থাকতেই হবে-এটাই নাকি নিয়ম।
বাড়ীর পিছনদিকের দুয়ারে দাদা শান্ত ভঙ্গিতে মাটিতে বসে আছেন।এই কনকনে ঠান্ডা শীতের রাতে তিনি স্রেফ একটা পাঞ্জাবী আর একটা পাতলা লুঙ্গী পরে আছেন।কিছুক্ষন পরপরই কুয়াশা এসে নাকে মুখে ধাক্কা মারছে।অমাবস্যার রাত,ইলেক্ট্রিসিটি নেই,ঘরের পিছন থেকেই শেয়াল ডেকে উঠছে একটু পরপর।বেশ ভয় ধরানো পরিবেশ।
দাদা লিখতে জানে না, তাই আমাকে ডেকে বললো,"নাতী,মাটির ঢাকনাতে আমি যা কমু তাই লিখবা,অন্য কিছু না,যা কমু তাই।"
আমি বললাম,"মাটির জিনিসতো, যদি লেখা বুঝা না যায়?"
তিনি বললেন,"বুঝা যাওয়া জরুরী না,খালি হাত ঘুরাইবা,লেখা হইলে হইবো না হইলে নাই।তয় সাবধান ভুল কইরো না।দরকার পড়লে বারবার জিগাইবা।"
আমি তার কথা মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখছি।দাদা একটা যায়গায় লিখতে বললেন, "তেত্রিশ কোটি দেব দেবতার শপথ, যদি না কথা শোন............।"
পরের অংশটা আমি উচ্চারণ করতে পারবো না,তাতে নিশ্চিত কুফরি হবে।লেখা বাদ দিয়ে মার মুখের দিকে তাকালাম।তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
দাদাকে বললাম,"দাদা এটা তো কুফরি, আপনি জানেননা?"
দাদাঃজানি,আমি না জানলে ক্যামনে হইবো।তুমি লেখো,না পারলে অন্য কেউরে ডাক দেও।এইটুক না করলে তো পারি নারে ভাই।"
আমি, মা আর দাদা ছাড়া এইখানে আর কেউ নাই,এতো রাতে কেউ থাকার কথাও না।অন্য কাউকে ডাকার ইচ্ছাও আমার নাই।শিক্ষিত কেউ যদি দেখে আমি কবিরাজ মহাশয়ের হেল্পার,তাহলে হাসির একটা গল্প পেয়ে যাবে তারা।কিন্তু আমি কুফরিও করতে পারবো না,হাসির গল্পও হতে পারবো না।
দাদা বললো, "কি হইলো কাউরে ডাকবা না তুমিই পারবা?"
আমি বললাম, "আমিই পারবো।"
মুখে বললাম কিন্তু আসলে কাজ করবো না।আমি সব কিছু তার কথা মতই লিখেছি কিন্তু শেষ বাক্যে একটা "না" যোগ করে দিয়েছি।তারমানে উনি যে মন্ত্র লিখতে বলেছে এখন সেটা উল্টো অর্থ প্রকাশ করবে।
এইবার আসল কাজ শুরু হলো,ঘড়িতে এখন ঠিক বারোটা বাজে।দাদা চুলা আর ঢাকনা হাত দিয়ে সালাম করে কপালে ঠেকালেন।চুলায় আগুন দেয়া হলো।দাদা পকেট থেকে কিসের যেন তেল আর রুপালী রঙের পাউডার বের করলেন।উল্টো করে বসানো মাটির ঢাকনায় তেল আর রুপালী পাউডার ঢেলে দিলেন।কিছুক্ষন তাপ দেয়ার পর যখন তেল ফুটতে শুরু করলো তখন মন্ত্র না কি যেন পিড়ে গ্লাস থেকে কিছুটা পানি তাতে ছুড়ে দিলেন।আমি চমকে পিছনে সরে গেলাম।কারন এর আগেও এরকমম দেখেছি,পানি ছুড়ে মারার সাথে সাথে আগুন কম করে হলেও দুই হাত উপরে উঠে যায়।আজকে তা হয়নি।আগে আগুন দেখে চমকে উঠতাম আজ উঠেছি আগুন না দেখে।দাদা আবার একই কাজ করলেন।এবারো ফলাফল আগের মতোই,আগুন উপরে উঠছে না।ধোয়ার একটা পাতলা রেশ ছিল আমার আর দাদার মাঝখানে।সেটা কেটে যেতেই দেখি দাদার চোখ দুটো ভাটার মতো জ্বলজ্বল করছে।খুব কাছেই একটা শেয়াল করুণ সুরে ডেকে উঠলো।আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম।দাদা মনে হয় আমার মতলব ধরে ফেলেছে।কারন এরকমটা আগে কখনো হয়নি।তিনি শুধু বললেন,"তেল বাটিতে রাইখা দিও,আর ঢাকনাটা এক ঢিলে ভাংবা।"
তারপর যেখানে ব্যথা সেখানে তেল মালিশ করার কথা বলে বিদায় নিলেন।
বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথে একটা স্বর্গীয় শান্তি পেলাম। আমি আজ অভিশপ্ত শয়তানকে সাহায্য করিনি।খুব ভালো লাগছে ভাবতে।
কবিরাজ দাদার সাথে যা হয়েছিল তা প্রায় ভুলে গেছি।তার সাথে পরে আরো বহুবার দেখা হয়েছে,স্বাভাবিক ভাবেই আমার সাথে কথা বলেছেন।কিন্তু তার সামনে যতবার এসেছি ততবারই একটা অস্বস্তি মনের ভেতর পাক খেয়েছে।নিজেকে বুঝিয়েছি আমি যা করেছি আল্লাহকে খুশি করার জন্য করেছি,আল্লাহ আমার সাথে আছেন,সুতরাং ভয়ের কিছু নাই।কিন্তু মন বলছে ভালো কাজ তো করেছি ঠিকই কিন্তু অজান্তে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলাম না তো,যে আমার চাইতে বেশি ক্ষমতা রাখে!
দ্বিতীয় খন্ডঃ
ভয় একটা রোগ,রোগের সঠিক চিকিৎসা করাতে হয়।তা না হলে রোগ বাড়ে। রোগ বাড়তে দিলে তা ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে।ভয়ে কারো ক্যন্সার হয়না ঠিকই তবে প্রচণ্ড ভয় পেলে মানুষ মারা যায়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভয় নামক জিনিসটার কোন স্বাভাবিক চিকিৎসা আমাদের দেশে হয় না।একজন মনোবিদ্যা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চাইতে আমাদের দেশের মানুষ কবিরাজের কাছে যেতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে।এতে টাকাও কম লাগে আবার অনেকের নাকি কাজও হয়!
আমি এসব কবিরাজি বিশ্বাস করি না,তবে এতে আমার আগ্রহ আছে!কবিরাজরা কি করে,কিভাবে করে;এসব দেখে আমি বেশ মজা পাই।
একদিন ঘটনাক্রমে আমাদের বাড়িতেই কবিরাজের আগমন ঘটলো।অসুস্থ আমার মা।তার মাথা ব্যথা;প্রচণ্ড ব্যথা।ব্যথা শুরু হলেই মা কীসব যেন দেখে আর ভয়ে কুকড়ে যায়।ডাক্তার দেখাতে দেখাতে মা বিরক্ত হয়ে গেছে।পছন্দ না হলেও মাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য কবিরাজ আমি নিজেই ডেকে এনেছি।এতে যদি মা-র মানসিক প্রশান্তি হয় তবে আমার আর সমস্যা কোথায়!
কবিরাজ সম্পর্কে আমার দূরসম্পর্কের দাদা হয়।
দাদার বয়স কত হবে তা আন্দাজ করা বেশ মুশকিল।তবে নব্বইয়ের কম কোনক্রমেই হবে না।গালের চামড়া কোঁচকানো,গায়ের রঙ অদ্ভুত কালো।অদ্ভুত কালো বলছি কারন দিনের বেলা তাকে স্বাভাবিক কালো বলেই মনে হয় কিন্তু রাতের বেলা চকচকে কালো মনে হয়!
অনেকে বলে দিনের বেলা সে মানুষ আর রাতের বেলা শয়তান হয়ে যায়।এই কথা প্রমাণ করতেই কিনা কে জানে, পুরু গোফ তাকে আরো ভয়ংকর করে তুলেছে।চোখ দুটো রাতে ভাটার মতো জ্বলজ্বল করে আর দিনের বেলা জবা ফুলের মতো লাল!
তিনি কোন দিন নেশা করেননি,তারপরেও মনে হয় ঘোর নেশাগ্রস্ত।এই ধারনা কেটে যায় যখন সে কথা বলে।আশ্চর্যরকম শান্ত আর সরল কথা।
তার কাজেও একটা সরলতা আছে,একটা ধারাও আছে।অমাবস্যার রাত ব্যতীত তিনি কাজ করেন না,আর কাজটা করেন রাত ঠিক বারোটার সময়।এখন রাত ঠিক এগারোটা পঞ্চান্ন।আসল কাজ শুরু হবে এখন থেকে ঠিক পাঁচ মিনিট পরে।আজকের আকাশে কোন তারা নেই।
আমিআগেও খেয়াল করেছি দাদার হাতে কোন ঘড়ি না থাকলেও,উনি কীভাবে যেন সঠিক সময় বের করে নেন।
এখনো তাই করলেন।
আমি তার কথা মতো জবা ফুল,শুকনো পাট খড়ি, একটা নতুন মাটির ঢাকনা একটা নতুন চুলা, একখণ্ড কাগজ আর একটা নতুন কলম জোগাড় করেছি।জবা ফুলের কোন কাজ নেই,কিন্তু জবা ফুল থাকতেই হবে-এটাই নাকি নিয়ম।
বাড়ীর পিছনদিকের দুয়ারে দাদা শান্ত ভঙ্গিতে মাটিতে বসে আছেন।এই কনকনে ঠান্ডা শীতের রাতে তিনি স্রেফ একটা পাঞ্জাবী আর একটা পাতলা লুঙ্গী পরে আছেন।কিছুক্ষন পরপরই কুয়াশা এসে নাকে মুখে ধাক্কা মারছে।অমাবস্যার রাত,ইলেক্ট্রিসিটি নেই,ঘরের পিছন থেকেই শেয়াল ডেকে উঠছে একটু পরপর।বেশ ভয় ধরানো পরিবেশ।
দাদা লিখতে জানে না, তাই আমাকে ডেকে বললো,"নাতী,মাটির ঢাকনাতে আমি যা কমু তাই লিখবা,অন্য কিছু না,যা কমু তাই।"
আমি বললাম,"মাটির জিনিসতো, যদি লেখা বুঝা না যায়?"
তিনি বললেন,"বুঝা যাওয়া জরুরী না,খালি হাত ঘুরাইবা,লেখা হইলে হইবো না হইলে নাই।তয় সাবধান ভুল কইরো না।দরকার পড়লে বারবার জিগাইবা।"
আমি তার কথা মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখছি।দাদা একটা যায়গায় লিখতে বললেন, "তেত্রিশ কোটি দেব দেবতার শপথ, যদি না কথা শোন............।"
পরের অংশটা আমি উচ্চারণ করতে পারবো না,তাতে নিশ্চিত কুফরি হবে।লেখা বাদ দিয়ে মার মুখের দিকে তাকালাম।তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
দাদাকে বললাম,"দাদা এটা তো কুফরি, আপনি জানেননা?"
দাদাঃজানি,আমি না জানলে ক্যামনে হইবো।তুমি লেখো,না পারলে অন্য কেউরে ডাক দেও।এইটুক না করলে তো পারি নারে ভাই।"
আমি, মা আর দাদা ছাড়া এইখানে আর কেউ নাই,এতো রাতে কেউ থাকার কথাও না।অন্য কাউকে ডাকার ইচ্ছাও আমার নাই।শিক্ষিত কেউ যদি দেখে আমি কবিরাজ মহাশয়ের হেল্পার,তাহলে হাসির একটা গল্প পেয়ে যাবে তারা।কিন্তু আমি কুফরিও করতে পারবো না,হাসির গল্পও হতে পারবো না।
দাদা বললো, "কি হইলো কাউরে ডাকবা না তুমিই পারবা?"
আমি বললাম, "আমিই পারবো।"
মুখে বললাম কিন্তু আসলে কাজ করবো না।আমি সব কিছু তার কথা মতই লিখেছি কিন্তু শেষ বাক্যে একটা "না" যোগ করে দিয়েছি।তারমানে উনি যে মন্ত্র লিখতে বলেছে এখন সেটা উল্টো অর্থ প্রকাশ করবে।
এইবার আসল কাজ শুরু হলো,ঘড়িতে এখন ঠিক বারোটা বাজে।দাদা চুলা আর ঢাকনা হাত দিয়ে সালাম করে কপালে ঠেকালেন।চুলায় আগুন দেয়া হলো।দাদা পকেট থেকে কিসের যেন তেল আর রুপালী রঙের পাউডার বের করলেন।উল্টো করে বসানো মাটির ঢাকনায় তেল আর রুপালী পাউডার ঢেলে দিলেন।কিছুক্ষন তাপ দেয়ার পর যখন তেল ফুটতে শুরু করলো তখন মন্ত্র না কি যেন পিড়ে গ্লাস থেকে কিছুটা পানি তাতে ছুড়ে দিলেন।আমি চমকে পিছনে সরে গেলাম।কারন এর আগেও এরকমম দেখেছি,পানি ছুড়ে মারার সাথে সাথে আগুন কম করে হলেও দুই হাত উপরে উঠে যায়।আজকে তা হয়নি।আগে আগুন দেখে চমকে উঠতাম আজ উঠেছি আগুন না দেখে।দাদা আবার একই কাজ করলেন।এবারো ফলাফল আগের মতোই,আগুন উপরে উঠছে না।ধোয়ার একটা পাতলা রেশ ছিল আমার আর দাদার মাঝখানে।সেটা কেটে যেতেই দেখি দাদার চোখ দুটো ভাটার মতো জ্বলজ্বল করছে।খুব কাছেই একটা শেয়াল করুণ সুরে ডেকে উঠলো।আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম।দাদা মনে হয় আমার মতলব ধরে ফেলেছে।কারন এরকমটা আগে কখনো হয়নি।তিনি শুধু বললেন,"তেল বাটিতে রাইখা দিও,আর ঢাকনাটা এক ঢিলে ভাংবা।"
তারপর যেখানে ব্যথা সেখানে তেল মালিশ করার কথা বলে বিদায় নিলেন।
বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথে একটা স্বর্গীয় শান্তি পেলাম। আমি আজ অভিশপ্ত শয়তানকে সাহায্য করিনি।খুব ভালো লাগছে ভাবতে।
কবিরাজ দাদার সাথে যা হয়েছিল তা প্রায় ভুলে গেছি।তার সাথে পরে আরো বহুবার দেখা হয়েছে,স্বাভাবিক ভাবেই আমার সাথে কথা বলেছেন।কিন্তু তার সামনে যতবার এসেছি ততবারই একটা অস্বস্তি মনের ভেতর পাক খেয়েছে।নিজেকে বুঝিয়েছি আমি যা করেছি আল্লাহকে খুশি করার জন্য করেছি,আল্লাহ আমার সাথে আছেন,সুতরাং ভয়ের কিছু নাই।কিন্তু মন বলছে ভালো কাজ তো করেছি ঠিকই কিন্তু অজান্তে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলাম না তো,যে আমার চাইতে বেশি ক্ষমতা রাখে!
দ্বিতীয় খন্ডঃ
যায়গাটা ধলেশ্বরী নদীর পাড় ঘেষে।অজপাড়াগা,রাস্তা নেই বললেই চলে।যেতে হয় হেটে না-হয় সাইকেল চালিয়ে।রাতের বেলা এই রাস্তা কেউ ভুলেও ব্যবহার করে না।ভুতে বিশ্বাস না করলেও মোটামুটি সবাই ভুতে ভয় পায়।কিন্তু এখানকার আসল ভয় ডাকাত।অসংখ্যবার এই রাস্তায় ডাকাতি হয়েছে।মানুষও মরেছে বেশ কিছু।
যায়গাটা সবাই চেনে কালীঘাট নামে, কিন্তু আসলে এর নাম শ্মশানঘাট।
এই জায়গার একটা ঐতিহাসিক গল্প রয়েছে,যদিও সঠিক ইতিহাস কেউ জানেনা তারপরেও অনেকে সেই ইতিহাস বিশ্বাস করে।
এখানে এক সময় কালীমন্দির ছিল।কথিত আছে বৃটিশ আমলের বহু পুর্ব থেকে ছিল মন্দিরটা।সময়মত পূজোও দেয়া হতো।পাকিস্তান পিরিয়ডে পাক সেনাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এখানে গোপনে পাক সেনাদের বলি দেয়া হয়েছিল।কিন্তু গোপন আর কতদিন, পাক সেনারা ক্রুদ্ধ হয়ে মন্দির একেবারে গুড়িয়ে দেয়,কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। শুধু পরে থাকে পাথরের বেদী।তারপর এখানকার হিন্দুরা ইন্ডিয়া পাড়ি দেয়ার আগে প্রতিশোধ হিসেবে বেশ কজন পাক সেনাকে ধরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে ঐ বেদীতেই।তারপর থেকেই জায়গাটা শ্মশান হয়ে গেলো।অল্প যে কজন হিন্দু এখনো রয়ে গেছে গ্রামে তারা আর নতুন করে মন্দির বানাতে পারেনি।অনেকের মতে ঐ পাথরের বেদী নাকি এখনো শ্মশান চত্ত্বরের ঠিক নিচেই আছে।সাহস করে কেউ প্রমান করতে যায়নি।কার ঠেকা পড়েছে ভয়ংকর এক ইতিহাস খুঁড়ে বের করবার!
তবে ঘটনা যাই হোক আমি এখানে এসেছি সেই ঐতিহাসিক শ্মশানঘাট দেখতে। দেখে মজা পাচ্ছি না।আসলে দেখার কিছু নাই।খোলা প্রান্তরে ধুধু বালুচর আর উৎকট গন্ধ ছাড়া কিছুই নেই।তাই সিদ্ধান্ত নিলাম রাতের বেলা আসবো।স্রেফ কৌতুহল ছাড়া আর কিছু না।কিন্তু আগে যদি জানতাম এখানে কী হবে তাহলে এক্ষুনি পালিয়ে যেতাম।
আমি এসেছি আমার পাশের বাড়ীর চাচা স্বপনের বোনের বাড়ীতে।উনি আমার আপন ফুপু না হলেও আমার সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে।স্বপন আমার ক্লাসমেট, ওকে অনেক কষ্ট করে রাজি করিয়েছি রাতে শ্মশানঘাট দেখতে যাবো।ও এমনিতে ভিতুর ডিম হলেও আজকে রাজী হলো।ফুপুকে কিছুই বলিনি, বললে আসতে দিতো না।
রাত এগারোটার দিকে চুপিচুপি সাইকেল নিয়ে দুজনে শুরু করলাম আমাদের এডভেঞ্চার।কুয়াশায় কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।তার ওপর অমাবস্যার রাত, হাতে একটা দুই ব্যাটারির টর্চ লাইট অন্ধকার যেন আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।শ্মশানঘাটের কাছাকাছি এসে পড়েছি ;এমন সময় কিশের যেন শব্দ শুনলাম।একটা গুঞ্জন ধীরে ধীরে বাড়ছে।আচমকা একদল লোক আমাদের সামনে উদয় হলো।মনে হলো কুয়াশার পর্দা ফুঁড়ে উদয় হয়েছে। আরেকটু হলেই হার্ট এট্যাক করতাম।লোকগুলো মড়া কাধে নিয়ে শ্মশানের দিকে যাচ্ছে।স্বপন সাইকেল চালাচ্ছিল,
সাইকেল থামিয়ে বললো," চল্ চলে যাই।"
আমি বললাম," তুই ভয় পেয়েছিস?আরে আমাদের তো কপাল ভালো,সাপে বর। দেখতে এলাম শ্মশানঘাট, এখন তো দেখা যাচ্ছে পুরো নাটকই মঞ্চায়ন করতে পারবো।কবে না কবে আবার চিতা জ্বলবে, আর তাছাড়া মানুষ আছেতো,ভয় কিসের।"
মিথ্যে বাহানা করছি।আসলে আমিও ভয় পেয়েছি।
স্বপন বললো,"এতো সাহস ভালো না।"আমি ভেবেছিলাম স্বপন সাইকেল ঘুরিয়ে চলে যাবে,তা না করে শ্মশানঘাটের দিকেই চলল।আমি অবাক হয়ে গেলাম স্বপন এরকম ঠান্ডা গলায় কথা বললো কেন?ওর তো আমার চাইতেও বেশি ভয় পাওয়ার কথা ছিল।
শ্মশান থেকে কিছুটা দূরে সাইকেল স্ট্যান্ড করে সামনে হেটে গেলাম।কিছু লোক কাঠ আগেই সাজিয়ে রেখেছিল।সেখানে মড়া রাখা হলো,আগুন দেয়া হলো মুখে।কাছে গিয়ে বেশ আশ্চর্য হলাম।মড়ার যায়গায় সাদা কাপড় ছাড়া কিছুই নেই, মানে মড়া নেই!
স্বপন আমাকে বলল পিছনে না তাকিয়ে দৌড় দে।আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন শক্তসমর্থ লোক স্বপনকে ধরে ফেললো।তারা স্বপনকে টেনে হিচড়ে শ্মশানে চাপাতে চাইছে,প্রত্যেকের চোখ আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে।এতক্ষণে খেয়াল করলাম প্রত্যেকের মুখেই পুরু গোফ, লোকগুলো বেশ লম্বা,প্রায় ছফুটের কাছাকাছি।কেন যেন ওদের পাকিস্তানী মনে হচ্ছে!
একজন ব্যক্তিকে দেখলাম স্বপনের শরীরে ঘি ঢালছে।তাকে দেখে আরো ঘাবড়ে গেলাম।নগ্ন আতংক কাকে বলে টের পেলাম।তিনি আর কেউ নন আমার দাদা, কবিরাজ দাদা!
আমি কখন দৌড় শুরু করেছি জানি না।সাইকেলে চেপে ভয়ংকর রকম গতি তুলে ফেললাম।এরই ফাকে পিছনে চেয়ে দেখলাম স্বপনকে শ্মশানে তুলে ফেলেছে লোকগুলো।ওর শরীর দাউদাউ করে জ্বলছে,তারপরেও ও বলে চলেছে পালা,পালা,পালা............!সাথে জোর শব্দে উচ্চারিত হচ্ছে, "তেত্রিশ কোটি দেব দেবতার শপথ,যদি না কথা শোন...........!
আমি আর এক মুহুর্ত দেরি না করে সোজা ফুপুর বাসায় চলে এলাম।অন্ধকার রাস্তা কিভাবে পাড়ি দিয়েছি ;কিচ্ছু বলতে পারবো না।এই কনকনে শীতের মধ্যেও আমি ঘামে চুপসে গেছি।সাইকেল দুয়ারে ফেলে দরজার উপর দমাদম ঘা মারতে শুরু করলাম।এখানে ইলেক্ট্রিসিটির বালাই নেই।ফুপু মোমবাতি হাতে দরজা খুলে দিলেন।আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলাম।তিনি একসাথে অনেক প্রশ্ন করছেন।আমি উত্তর দিতে পারলাম না।কারন ঘরে প্রবেশের সাথে সাথে জমে বরফ হয়ে গেলাম।মাথা ঘুরে পরে যাওয়ার একমুহুর্ত আগে দেখতে পেলাম আমার সামনেই লেপ গায়ে শুয়ে আছে স্বপন!
ফুপুর বাড়ী থেকে চলে আসার বেশকিছু দিন পর খবরের কাগজে চোখ আটকে গেলো।খবরটা শ্মশানঘাট নিয়ে লেখা,যেখানে আমি গিয়েছিলাম।একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে শ্মশানে।অদ্ভুত খবর হচ্ছে শ্মশানে গত দুই মাসে কোন চিতা জ্বলানো হয়নি,অথচ ঐ ব্যক্তির লাশ মুখ বাদে পুরো শরীর পুরে ছাই হয়ে গেছে!কেউ যেন ভয়ংকর প্রতিশোধ নিয়েছে লোকটার উপর।এমন প্রতিশোধ মানুষের পক্ষে নেয়া সম্ভব না।
আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি লাশের ছবিটার দিকে।আর কেউ না চিনলেও আমি এই জ্বলজ্বলে চোখের বৃদ্ধ লোকটাকে ভালো করেই চিনি!
আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি লাশের ছবিটার দিকে।আর কেউ না চিনলেও আমি এই জ্বলজ্বলে চোখের বৃদ্ধ লোকটাকে ভালো করেই চিনি!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন