পার্থক্য

মানুষ মাত্রই মিথ্যা বলে।মিথ্যা কী সবাই বলতে পারে?বোবা কী মিথ্যা বলতে পারে?
প্রশ্নটা কী বোকা বোকা মনে হচ্ছে?যে কথা বলতে পারে না সে আবার কিভাবে মিথ্যা বলতে পারে?
উত্তর হচ্ছে;হ্যা পারে।কথা না বলেও মিথ্যা প্রকাশ করা যায়।মুখে বলা মিথ্যা আর প্রকাশ হওয়া মিথ্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।
পার্থক্য মানেই দুটো জিনিসের মধ্যে ব্যবধান নয়।এই বোধের অভাবই আমাদের স্থবির জাতীতে পরিণত করেছে।তাই মনে হয় যেখানে একজন বোবা মিথ্যা বলতে পারে সেখানে আমার নিজের অবস্থান কোথায়?

মিথ্যা বলার পরেও অনেকে মুখে বলে সত্যি বলছি।আবার কেউ মিথ্যা বলে না ঠিকই তবে সত্যকে লুকিয়ে রাখে।
আমি একজন চাঁদাবাজের মুখে শুনেছি,"সৎ পথে আছি তাই কোন বিপদআপদ হয় না।"এটা আমাদের ধর্ম,  ভাল কাজের দোহায় দেয়া আর খারাপ কাজ করে ভাল ফল আশা করা।কেউ কেউ তো আবার কাজ না করেও ফল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে।
এতো এতো মিথ্যা,এত তার রুপ; নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।
নিজের রুপ লুকিয়ে রাখার জন্য কত কিছুই না করি।কাজের কাজ কিছু না করেই বাহানা করি,আমি এইটা করেছি ওইটা করেছি।আবার মিথ্যার মধ্যেও পার্থক্য করি।এটা কম ক্ষতিকর,ঐ মিথ্যায় ক্ষতি নেই,সেই মিথ্যায় দোষ নেই, আরো কত কত তার পার্থক্য।


বিয়ে শাদি আর ব্যবসাতে মিথ্যা না বললে নাকি এখন আর কাজ হয় না।তাই লোকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে।যে মেয়ে কোনদিন নামজ পরে নাই তাকেও পরহেজগার বানিয়ে দেয়া হয়।চরম বেয়াদবরাও বিয়ের পিড়িতে বসার আগে ভদ্রতার মূর্ত প্রতিক হয়ে যায়।মিথ্যা এখন এমন আসনে যে,নিয়ম আর অনিয়মের মধ্যেও আর কোন পার্থক্য নাই।
যাক সেসব কথা, কে ভদ্র আর কে অভদ্র তাতে আমার কি আসে যায়।আমার কিছু বলার নেই।অন্যের সম্পর্কে বলা বাদ দিয়ে এবার নিজের কথা বলি।

আমার চাচার বিয়েতে খানা খাওয়ানোর দায়িত্ব পালন করছি।সব অনুষ্ঠানেই খাবার খাওয়াতে আমার বরাবর ভাল লাগে।কিন্তু কখনো দায়িত্ব নিয়ে খাওয়াইনি।ইচ্ছে মত কাজ করা আর দায়িত্ব পালন করা ভিন্ন কথা।সেই ভিন্নতা থেকেই কিনা কে জানে
মেহমানদের খাওয়াতে গিয়ে কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছি,কেন জানি খুব লজ্জা লাগছে।কাকে কী বলব কিছুই বুঝতে পারছি না।আমার সাথীরা আমাকে তাড়া দিল,কিন্তু আমি অনড়।
অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল যখন মেহমানদের খানা শেষ হয়ে গেল।প্লেট পরিষ্কার করতে গিয়ে টের পেলাম আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি অথচ অন্য মেহমানরা অলরেডি বসতে শুরু করেছে।
এটা কেন হলো?যে আমি ছিলাম মেহমানদারীতে ওস্তাদ, সেই আমিই এখন নির্বাক মূর্তি।
মুহূর্তেই মনে হল আমি আসলে অহংকারী হয়ে গেছি,নইলে আমি কেন আমার মতো দেখতে মানুষের চাইতে নিজেকে বেশি সম্মানিত মনে করছি?তাদের প্লেট কেন পরিষ্কার করতে পারছি না?
আমি মনে হয় অবচেতন মনে এটাই চিন্তা করছি,"আমি অন্যের প্লেট পরিষ্কার করে দেবো,আমি?"আমি একটা অনার্স পাশ ছেলে!
কী ব্যাপার,এটা তো আমাকে কেউ শিক্ষা দেয়নি!সব মানুষই সমান।তাহলে কী সমাজ শিক্ষা দিয়েছে?
হতে পারে।এই দেশের সমাজ সব ধরনের শিক্ষাই দেয়,তা সে পাঠ্য বইতে না থাকুক।
কাজ করতে এসে এত ভাবলে তো হবে না,এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না,কিছু একটা করতে হবে।
যখন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি ঠিক এই সময় একজন মহিলা খুব তাড়াহুড়া করে উচ্ছিষ্ট খাবার গুলো পলিথিন ব্যাগে ভরতে শুরু করলো।তাকে দেখে খুশি হলাম। সে আমার কাজ করে দিচ্ছে এটা খুশি হওয়ার মত ঘটনা।খুশি হলাম বটে কিন্তু খুশি দীর্ঘস্থায়ী হল না।আমার সাথে যারা ছিল তারা ঐ মহিলাকে দুরদুর করে তারিয়ে দিল।
ঐ মহিলা আসলে আমার কাজ করে দিচ্ছিল না,সে নিজের খাবার যোগার করছিল।
ঢাকাতে আমি এরকম অনেক দেখেছি।ঢাকাতে এটা খুব জনপ্রিয় একটা ব্যবসা।কিন্তু আমাদের এই পল্লি গ্রামে?

আমার হাতে একটা রোষ্ট ছিলা,সেটা হাত থেকে পরে গেল।মহিলাটি সেই রোষ্ট মাটি থেকে থাবা মেরে তুলে নিল।আমার সংগীরা মহিলাটিকে আবার হাত তুলে তাড়িয়ে দিতে উদ্দত হল।
এই প্যান্ডেলের ভিতরেই একদল বাচ্চা ছেলেকে কুকুর তাড়ানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।আমি তাদের কুকুর তাড়ানোর ভঙ্গী আর আমার সংগীদের ভঙ্গীর মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারলাম না।এইবার পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমি আসলে কে?
আমি নিছক লজ্জা পাচ্ছিলাম, যাতে আছে সম্মান।আর যেখানে আমার সম্মান ছিল সেখানেই লজ্জা পাচ্ছি।
নিজেকে কেন মানুষ বলছি,এটা কিসের বিয়ের অনুষ্ঠান?
নিজেকে তখন বুঝাতে শুরু করলাম "সিফাত সাহেব,আপনাকে লজ্জিত হতে হবে না,কারন আপনার লজ্জা নেই।সামান্য একজন মানুষ খাওয়ানোর যোগ্যতা নেই অথচ গ্রাম শুদ্ধ দাওয়াত দিয়েছেন।"

মানুষ খায় মানুষের উচ্ছিষ্ট
মানুষেতে নাই সবুর,
কে বলেছে মানুষ আমায়
কে বলেনি কুকুর!

হে রুপের জগতের মানুষ জাতি;
কতিপয়কে শাস্তি না দিয়ে
আমাকে শাস্তি দাও,
নিজের রুপ না দেখিয়ে
আমার রুপটাই কেরে নাও।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস