মৃত্যু

অনেক্ষন যাবৎ চেষ্টা করিয়াও যখন যৎসামান্য ময়লা তুলিতে পারিলাম না,তখন খুব করিয়া লাগিয়া গেলাম।আংগুলের নখ দিয়া চুলকাইতে চুলকাইতে গায়ে রক্ত  বাহির করিয়া ফেলিলাম।হঠাৎ বোধ বুদ্ধির উদয় হইল।উহা তো ময়লা নহে, উহা তিলক!
(এটাও আমাদের রোজকার কাজ।যাকে মুরুব্বিরা আকাম বলে থাকে।কিছু কিছু লোক আবার আমাদের দিয়ে এসব কাজ করিয়েও থাকে)

একঃ
পরিক্ষার ফাকে বা কাজের ফাকে যদি মাঝেমধ্যে ভ্রমন করা যায় তাহলে সেটা শারীরিক ও মানষিক উভয়ের জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে।আমি অবশ্য আজকে আনন্দ ভ্রমনের জন্য বের হইনি,বের হয়েছি রিজিকের সন্ধানে।আগামীকাল আমার একটা ভাইবা আছে,তেমন নামকরা কোম্পানি না,তবে বসে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করার চাইতে এই চেষ্টা উত্তম।

আজ পহেলা মে,রাস্তায় মানুষ আছে;গাড়ি নেই।আমার এমনিতেই ঢাকা শহর ভাল লাগে না,তার উপর আজ গাড়ি নেই।মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।তবে খুব বেশি দেড়ি হলো না একটা সুন্দর প্রাইভেট কার পেতে।ড্রাইভার হাত দিয়ে ইশারা করছে,ঢাকা যাবো কিনা জানতে চায়।প্রাইভেট কারে যেতে আমার মন সাড়া দিচ্ছে না।কারন আজকাল এসব যানে অপকর্ম হচ্ছে হরহামেশাই।আমার এক বড়ভাইকে ঈদের সময় ধরেছিল এইরকমভাবে।বাড়ি যাওয়ার পথে সবকিছু রেখে দিয়েছিল।ছেড়ে দেয়ার আগে বলেছিল,"ভাই,আমরাও শিক্ষিত,মাস্টার্স পাশ,কাজ কর্ম নাই, তাই ছিনতাই করি।আপনি ছাত্র,আপনাকে সম্মান করে উচিৎ, তাই তিনশ টাকা দিলাম,বাড়িতে চলে যান।পিছন দিকে তাকাবেন না।"
আমি এই কথা শোনার পর খুব হেসেছিলাম কিন্তু আজ হাসতে পারছি না।
আমার কাছে তেমন কিছু নেই যে ছিনিয়ে নেবে,আমার ভয়টা এখানে না, ভয় নিজের পকেট নিয়ে।কারন সেখানে বেশি টাকা নাই!গাড়িভাড়া যে স্বাভাবিকের চাইতে কয়েকগুণ বেশি হবে তা কেউ বলে না দিলেও জানি।
যাহোক আর কিছু চিন্তা না করে উঠে পড়লাম,যেতে আমাকে হবেই,তাই একটা চাকরী পেলে এইই লোকসান উঠে যাবে।

সে যাত্রায় কোন সমস্যা হয়নি।তবে একটা ঘটনা ভুলতে পারছি না।চন্দ্রা পার হতে দেখালাম গার্মেন্টস এর ছেলে মেয়েরা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে,সুন্দর জামা কাপড় পড়েছে।ছোট ছোট দোকান থেকে সাধ্য অনুযায়ী জিনিসপত্র কিনছে।ঠিক যে রকমটা আমাদের গ্রামের বৈশাখী মেলায় দেখা যায়।ওদের দেখে খুব ভাল লাগছে,যারা এতো পরিশ্রম করে তাদের কাছে আজকের দিনটা হয়তো ঈদের মতোই আনন্দের।কিন্তু ঈদের দিনও কিছু মানুষ আনন্দে থাকে না।
একজন মহিলাকে দেখলাম;কয়েকজন পুরুষ ধরাধরি করে নিয়ে আসছে।দেখে মনে হচ্ছে এরা সবাই গার্মেন্টস ওয়ার্কার।মহিলা বেশ অসুস্থ,গুরুতর অসুস্থ।একটু পরপরই বমি করছে।কয়েকজন মহিলা রাস্তায় বসেই মাথায় পানি ঢালছে।আজ পহেলা মে, রাস্তায় গাড়ি নেই।আমার পাশ থেকেই ডাইভার বলে উঠলো, "ভাই আমাদের মতো মানুষের পহেলা মে পালন করলে পেট চলবে কিভাবে?ঐ মহিলা হাসপাতালে যেতে পারছে না শুধুমাত্র গাড়ির কারনে।আমি ভাই মে দিবসকে সম্মান করি কিন্তু পালন করতে পারব না।"

এর আগেও আমি এরকম দেখেছি কিন্তু  দেখার মত চোখ তখন ছিল না।ভবিষ্যতের চিন্তায় তখনো দেশেহারা ছিলাম।গাড়ি চলছে না থেমে আছে সেদিকে খেয়াল ছিল না। মানুষের আহাজারি আর কান্নায় চিন্তা পালিয়ে গেছে।হঠাৎ কোত্থেকে জানি না,আচমকা এক্সিডেন্ট হয়েছে!
সবাই ছুটাছুটি করেছে।একবার পাকুল্যার কাছে এরকম দেখেছি।মির্জাপুর কুমিদিনি হাসপাতাল খুব কাছেই।কিন্তু তখন এমন জ্যাম লেগে ছিল যে,একটা রিক্সাও বের হতে পারেনি।নিরবে মানুষগুলোর আর্তনাদ শুনেছি,মানুষ মরতে দেখেছি।
মির্জাপুর থেকে পাকুল্যা আসার পথে কিছু ভয়ংকর বাক আছে,এই বাকগুলো ঘুরতে গিয়েই অধিকাংশ বাস-ট্রা মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে বহুদিন যাবৎ উদাসিন।

পহেলা মে মানুষ মরে রাস্তায় গাড়ি না থাকার কারনে আর সেদিন মানুষ মরেছে গাড়ি বেশি থাকার কারনে।

নিজের অজান্তেই বুকের ভিতর মোচর দিয়ে উঠছে।আমাদের দেশে যারা অসহায় তাদেরকে আমরা শুধু পাঠ্য পুস্তকেই চিহ্নিত করি,বাস্তবে চিনি না।আমাদের দেশের যারা রাজনীতিক,যারা নীতি নির্ধারক তাদের এসব দেখানো দরকার।তাদের বলে দেয়া দরকার, "আপনাদের সবচাইতে বড় কাজ বিরোধী দলের সমালোচনা করা না।আপনাদের সবচাইতে বড় কাজ,যার মাথায় হাত দেয়ার কেউ নেই,তাদের মাথায় হাত দেয়া।"

দুইঃ
বন্ধু জাকিরের মেসে থেকে পরদিন সকাল সাতটায় রওয়ানা হলাম অফিসের উদ্দেশ্যে।আজকে পর্যাপ্ত গাড়ি আছে কিন্তু জ্যামের কারনে পা ফেলা দায়।বাধ্য হয়ে বিশ টাকার গাড়ি বাদ দিয়ে সি,এন,জিতে উঠলাম,ভাড়া দুইশ টাকা।কিছুই করার নেই।অফিসে গিয়ে সময়মতই পৌঁছলাম।কিন্তু স্যারদের দেখা নাই।সকাল নয়টায় ভাইবা হওয়ার কথা এখন বাজে সাড়ে দশটা।কিছুক্ষন বসে থাকার পর একজন চরম বেয়াদব টাইপের লোক এসে বলল,"আপনারা এখানে কি করছে?"
আমি বললাম,"আমার ভাইবা আছে।"
"কে পাঠিয়েছে আপনাদের?"
আমিঃকেউ পাঠায়নি,আমাকে অফিসের হট লাইন থেকে ফোন করে ডেকে আনা হয়েছে।"
"কে ভাইবা নেবে আপনার, জি এম, এজি এম কেউ অফিসে নাই।"
আমার পাশে থাকা এক বড় ভাই বলল,"তাহলে আমাদের আজকে ডাকা হল কেন?"
লোকটা চরম বিরক্তি ভরে বলল,"সেটার আমি কি জানি,আপনারা হেড অফিসে জান।"
ঠিকানা চাইতেই লোকটা আরো বিরক্তি ভরে বলল, "খুজে বেড় করুন,একটা অফিস খুজে বেড় করতে পারেন না,আবার ভাইবা দিতে এসেছেন।"
বুঝলাম এই লোকের সাথে কথা বলা বৃথা,বাধ্য হয়ে বন্ধু গুগলের সাহায্য নিলাম।এখন যেতে হবে গুলশান এক-এ।মহাখালী পর্যন্ত সবে গিয়েছি,এমন সময় অফিস থেকে ফোন," আপনারা আগামীকাল আসেন।"

কিছু করার নেই।টাংগাইল চলে আসবো সেই সুযোগও নেই,তাহলে ভাইবা মিস হবে।বন্ধু জাকিরের বাসায়ও যেতে ইচ্ছে করছে না।আমার কারনে ছোট ভাই শামিমের খুব কষ্ট হচ্ছে।প্রথমত ওদের বুয়া নেই,শামিম বাজার করছে- তিনবেলা রান্নাও করছে।দ্বিতীয়ত,শামিম ওর নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্যান ছাড়া একটা রুমে গিয়ে প্রচন্ড গরমে ঘুমাচ্ছে।
ভাবতে খুব খারাপ লাগছে,তবুও আমার সেখানেই ফিরে আসলাম।রাতের জন্য শামিম মুরগী রান্না করেছে,ওর রান্না ভাল।

যাহোক,পরদিন সকালে আবার সি,এন,জি যাত্রা।অফিসে গিয়ে দেখি পনেরোষোলো জন ভাইবা দিতে এসেছে।বসার মতো সিট আছে পাঁচটা, সেখানে অফিসের একজন বসে আছে।বাকীরা দাঁড়িয়ে আছি।টানা চার ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আর পারছি না,তখন একজন বলল, "যারা নোয়াখালী থেকে এসেছেন, তারা আগে আসেন,আর যারা রেফারেন্স ছাড়া এসেছেন তারা চলে যান।"আমি সাহস করে বললাম স্যার আমি গতকালও ভাইবা দিতে এসেছিলা,আমি তো রেফারেন্স এর মাধ্যমে আসিনি,কিন্তু আমাকেও তো ডাকা হয়েছে।"
তিনি বলল,"আপনার এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেট দিন।"
আমার কাছে কোন এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেট নাই,আমি যেখানে আগে কাজ করেছি সেখানে কোন সার্টিফিকেট দেয়া হয় না।এখন বাজে বেলা একটা।সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছুই খাওয়া হয়নি,গতকালও সারাদিনে মাত্র একবার খেয়েছি।
চুপ করে নিচে চলে আসলাম,ভাইবা না দিয়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটা ধরলাম।
অনেকেই ফোন করেছে,ভাইবাতে কী হল।সবাইকে একই উত্তর দিয়েছি,"অফিস থেকে পরে জানাবে বলেছে।"

শেষঃ
গাড়ি চালকের হয়তো সাজা হবে,কিন্তু যার ক্ষতি হয়েছে সে ছাড়া আর কেউ সেই ক্ষতি অনুধাবন করতে পারবে না।গাড়ি চালকের হয়তো সাজা হবে,কিন্তু আমাদের যারা ইচ্ছা করে বেকার রেখেছে তাদের সাজা দেবে কে?
মানুষ মরছে।অকারনে কোন
আনুষ মরে না।দর্শন, নীতিবিদ্যা, কার্যকারণ-এগুলো আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে-কারন ছাড়া মানুষ মরে না।আমরা সবাই মরে যাবো,কোন একটা কারনে।
কে যেন লিখেছিল,"মরার আগে কাপুরুষ মরে বহুবার।"-আপনি ভুল লিখেছেন স্যার,আমরা বেকাররা কাপুরুষ না-তবু প্রতিদিন মরতে হচ্ছে।শুধুমাত্র কিছু লোকের লোভ,কিছু ভুল আর কিছু লোকের স্বজনপ্রীতির কারনে।আপনারাও স্বদেশ প্রেম পড়েছেন স্যার।দেশের মানুষ বাদ দিয়ে যে স্বদেশপ্রেম, তার কার্য দেখেছি,কারন কোথায়?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস