কালভার্ট
"আল্লাহ রহম করছে তোরে, সাহস দেখে বাচি না, একা একা গেছে ভাংগার পার, তাও আবার রাতের বেলা। তির ভয় ডর কিছু নাই!"
আমাদের গ্রামের শেষ মাথায় একটা কালভার্ট আছে।গ্রামের সবাই ওটাকে ভাংগার পার বলে। এক সময় সত্যিই ঐ জায়গাটা গভীর খানা খন্দে ভর্তি ছিল। সে সময়ের কিছু ভৌতিক কাহিনি আছে। তাই জায়গাটাকে সবাই সমিহের চোখে দেখে।
ভাংগার পারের অনেক গল্প আছে। গল্পতো অনেকই থাকে, সব গল্প বিশ্বাস করা ঠিক না। একটা গল্প বলছি।গল্পটা আমার দাদার আমলের।
কালভার্টের কাজ পেয়েছিলেন স্থানীয় এক মাতব্বর,তার নাম জানি না। তবে রেকর্ডে আছে এই কালভার্টের কাজের দ্বায়িত্ব ছিল নজরুল ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। কালভার্ট করার সময় নজরুল ইঞ্জিনিয়ার অনেক নাজেহাল হয়েছেন। কারন স্থানীয় কেউ এখানে কাজ করতে চায় না। সবাই ভয় পায়। ভয়ের কারন ভয়! জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলতে পারে না৷ তারা নাকি কাজ করতে গেলে ফোসফোস শব্দ শোনে।
অনেক কষ্টে দুই একজনকে রাজি করানো গেলেও নজরুল ইঞ্জিনিয়ার পড়লেন আরো বড় বিপদে, যাকে বলে চুড়ান্ত বিপদ। তিনি কালভার্টের পিলার করেন, পরের দিন এসে দেখেন পিলার নাই! পানিতে ডুবে গেছে। তিনি অনেক চেষ্টা করেও যখন পার পাচ্ছিলেন না। শক্ত মাটিতে পিলার ডুবে যায় -এটা তিনি কল্পনাতেই আনেননি। নিজেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেউ হয়তো ভয় দেখাতে চাইছে৷ কিছু টাকা পয়সা আদায় করবে। কিন্তু অন্যদিকে মোড় নিলো যখন গ্রামের এক মুরুব্বি বললো,"এইখানে জ্বিন থাকে তারে রক্ত না দিলে পিলার থাকবো না।"
অনেক চেষ্টায় মানুষ সফল না হলে অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করতে শুরু করে। নজরুল ইঞ্জিনিয়ার এর মতো ব্যক্তিও তাই মেনে নিলেন। তবে তিনি জ্বিনের বিষয়টা বিশ্বাস করলেন না। একটা মোটাতাজা ষাড় কোরবানি করা হলো। এবং আশ্চর্য কথাটি হচ্ছে তারপর আর পিলার ডুবে যায়নি! এখনো সেই কালভার্ট টিকে আছে।এই কাহিনির কারনেই মা আমাকে নিয়ে ভয় পেয়েছেন।
"কে কইছে তোরে রাতের বেলা ঐ অলুক্ষণে যাগায় যাওনের?"
সকালের খাবার খাচ্ছি, সাথে খাচ্ছি মার বকুনি। আলু ভর্তা ভাল হয়েছে, ঝাল কম। কিন্তু বার বকুনিতে এখন ঝাল ঝাল মনে হচ্ছে।
আমি চুপ করে খাচ্ছি। আমার ছোট বোন সবে মাত্র অনার্স কমপ্লিট করেছে। বিজ্ঞান মনষ্ক মেয়ে। আশায় আশায় ওর দিকে তাকালাম। ও চোখ সরু করে গভীর মনোযোগে আমাকে কিছুক্ষন পর্যবেক্ষণ করে বলল,"প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটে সব কিছু জানতে চাওয়া উচিৎ না। There are many things in heaven and earth.-এটা কে বলেছে জানতো?"
আমি বললাম,"শেক্সপিয়ার তো লেখক ছিলেন তিনি যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন। এর সাথে আমার সম্পর্ক কি? আমি তো কিছুই দেখিনি। শুধু শব্দ শুনেছি।"
মা এতোক্ষন আমার দিকে রাগের সহিত তাকিয়ে ছিলেন,"কিছু না দেখলি, শব্দ তো শুনছিলি, তখনই চলে আসলি না কেন?"
আমি কিছু বুঝতে পারছি না। যা আমি দেখিনি তা দেখে কেন ভয় পাবো? আবার আমার কথায় সবাই ভয় পাচ্ছে এবং তারা চাচ্ছে আমিও ভয় পাই! বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং! জোর করে ভয় পাওয়ার চেষ্টা চলছে!
খাওয়া শেষ করে বললাম,"আর যাবো না,ঠিক আছে?"
মা রাগ করেই বললেন,"ঠিক আছে।"
এবার ঘটনাটা খুলে বলি। এটা কোন গল্প না,তাই মিথ্যা বলে আকর্ষণ বাড়িয়ে লাভ নেই। গল্পে চরিত্র থাকে প্রেক্ষাপট থাকে এই ঘটনায় তেমন কোন চরিত্র নেই শুধু প্রেক্ষাপট আছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি। বিদ্যুৎ নেই, প্রচন্ড গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা। চারিদিকে বন্যার পানি থইথই করছে। নদী, নালা, খাল বিলের পানি উপচে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আবহাওয়া সকাল বিকাল পরিবর্তন হচ্ছে। এই ঝুম বৃষ্টি তো এই প্রচন্ড রোদ-এই হচ্ছে অবস্থা।
রাত এখন প্রায় এগারোটা। পল্লী গ্রামে রাত এগারোটা মানে গভীর রাত। কারেন্ট নেই। প্রচন্ড গরমে ঘুম ছুটে গেছে আরো আগেই। এই সময় চাচাতো ভাই বিদেশ থেকে ফোন করলো। এতো রাতে কেউ ফোন করলে বিরক্ত লাগে, আজকে লাগলো না। বরং কিছুটা ভালই লাগলো।বাইরে গিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে আসি। ফোন হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। হাটতে হাটতে কখন কালভার্ট পর্যন্ত চলে এসেছি টের পাইনি। আসার সময় টর্চও নিয়ে আসিনি। কালভার্ট আমার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। কালভার্টের দুই পাশে যতদূর ছোখ যায় শুধু চাষের জমি। এখন অবশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা চাষের জমি। হটাৎ কেউ দেখলে বলে বসবে এটা একটা বিরাট শান্ত নদী! শুধু রাস্তাটা চলে গেছে নদীর মাঝ বরাবর। কালভার্ট পর্যন্ত এসে থমকে দাড়ালাম। প্রকৃতির সৌন্দর্যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। আকাশ হালকা মেঘে ঢাকা। মনে হচ্ছে ক্যানভাসে খুব দক্ষ কোন শিল্পি ছোপ ছোপ রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে। সেই রঙের আবার ছায়া পড়েছে বিলের স্বচ্ছ পানিতে! কি অপার্থিব দৃশ্য। চোখ জুড়িয়ে যায়। সাথে আছে মন জুড়ানো মিষ্টি হিমেল হাওয়া। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না অথচ চারিদিক পরিষ্কার। সাদা কালো মেঘের মাঝে চাদের আলো যে কিরকম দেখতে হায় তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি দুই ধারের প্রায় সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি। এমনকি বিলের ছোট চকচকে মাছ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। কালভার্টের সাথে বেশ কয়েকটা বড় গাছ আছে। গাছের নিচে দাড়িয়ে কথা বলছি।আবছায়া পরিবেশ। চাচাতো ভাইয়ের সাথে কি কথা বলছিলাম কিছুই মনে নেই, শুধু হু হা উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। অল্প সময়েই গরমের ক্লান্তি ভাব চলে গেল।
চারিদিকে ছোখ বুলিয়ে দেখছি। এমন সময় একটা শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা এসেছে আমার পিছনের কালভার্ট থেকে। শব্দ বেশ জোড়ালো। প্রচন্ড শক্তিশালী কোন ষাড় ফোসফোস করলে যেমন শব্দ হয় তেমনি শব্দ। প্রথমে পাত্তা দেইনি। কারন আমি খুব ভাল করেই জানি এই বিলে পোষা ঘোড়া থাকে। এরা সারারাত বিলেই থাকে। কিন্তু একটা সময় পাত্তা দিতে বাধ্য হলাম। কারন শব্দটা এগিয়ে আসছে। ফোনে বিদায় নিলাম চলে যাবো বলে। এতো রাতে কেউ মাছ ধরতে আসার কথা না কারন বর্ষাকালে সাপের ভয় আছে।আর একটা ঘোড়া এই রাতের বেলা আমার ঘাড়ের সামনে চিহিচিহি করবে এটা ভাল লাগবে না।ফোসফোস শব্দের কারনে কিছুটা বিরক্ত হলাম।এতো সুন্দর পরিবেশে বিদঘুটে শব্দটা আমার কাছে শব্দ দূষণ মনে হচ্ছে।
আচমকা মনে পড়লো ঘোড়া ফোসফোস শব্দ করে না, অনেকটা চিহিচিহি শব্দ করে! তাহলে এটা কিসের শব্দ? কারো গোয়াল থেকে কি ষাড় পালিয়েছে?পরক্ষনেই সিদ্ধানটা বাতিল করে দিলাম। এখানে ষাড় আসবে কোত্থেকে। তখন খেয়াল হলো বিলে প্রায় এক মানুষ সমান পানি!
এখন কি আমার ভয় পাওয়া উচিৎ? হ্যা উচিৎ।
কিন্তু আমি অজানা কারনে ভয় পেলাম না, বরং বিরক্ত লাগলো। চারিদিকে প্রায় সবকিছুই দেখা যাচ্ছে, তারপরেও মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বেলে দেখার চেষ্টা করলাম। ফ্লাশ লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন ছিল না, এমনিতেই সবকিছু পরিষ্কার। সামনে এগিয়ে গেলাম শব্দের উৎস খুজতে। শব্দ আমার খুব কাছে হচ্ছে অথচ আমার সামনে টলটলে পানি ছাড়া কিছুই নেই।আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কিছু একটা দেখার জন্য, কিন্তু কিছুই নেই, আছে শুধু প্রচন্ড শক্তিশালী কোন ষাড়ের ফোসফোস শব্দ।
মনে খুব আশা ছিল অপার্থিব কিছু দেখবো। অপার্থিব কোন কিছু চাক্ষুষ করা বিরল সৌভাগ্যের ব্যপার। কিন্তু আমার আশায় গুড়ে বালি। আমি কিছুই দেখতে পাইনি। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর অনেক দূরে কারেন্টের একটা লাইট জ্বলে উঠতে দেখলাম। তার মানে বিদ্যুত চলে এসেছে। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ি চলে এলাম।
আমাদের গ্রামের শেষ মাথায় একটা কালভার্ট আছে।গ্রামের সবাই ওটাকে ভাংগার পার বলে। এক সময় সত্যিই ঐ জায়গাটা গভীর খানা খন্দে ভর্তি ছিল। সে সময়ের কিছু ভৌতিক কাহিনি আছে। তাই জায়গাটাকে সবাই সমিহের চোখে দেখে।
ভাংগার পারের অনেক গল্প আছে। গল্পতো অনেকই থাকে, সব গল্প বিশ্বাস করা ঠিক না। একটা গল্প বলছি।গল্পটা আমার দাদার আমলের।
কালভার্টের কাজ পেয়েছিলেন স্থানীয় এক মাতব্বর,তার নাম জানি না। তবে রেকর্ডে আছে এই কালভার্টের কাজের দ্বায়িত্ব ছিল নজরুল ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। কালভার্ট করার সময় নজরুল ইঞ্জিনিয়ার অনেক নাজেহাল হয়েছেন। কারন স্থানীয় কেউ এখানে কাজ করতে চায় না। সবাই ভয় পায়। ভয়ের কারন ভয়! জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলতে পারে না৷ তারা নাকি কাজ করতে গেলে ফোসফোস শব্দ শোনে।
অনেক কষ্টে দুই একজনকে রাজি করানো গেলেও নজরুল ইঞ্জিনিয়ার পড়লেন আরো বড় বিপদে, যাকে বলে চুড়ান্ত বিপদ। তিনি কালভার্টের পিলার করেন, পরের দিন এসে দেখেন পিলার নাই! পানিতে ডুবে গেছে। তিনি অনেক চেষ্টা করেও যখন পার পাচ্ছিলেন না। শক্ত মাটিতে পিলার ডুবে যায় -এটা তিনি কল্পনাতেই আনেননি। নিজেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেউ হয়তো ভয় দেখাতে চাইছে৷ কিছু টাকা পয়সা আদায় করবে। কিন্তু অন্যদিকে মোড় নিলো যখন গ্রামের এক মুরুব্বি বললো,"এইখানে জ্বিন থাকে তারে রক্ত না দিলে পিলার থাকবো না।"
অনেক চেষ্টায় মানুষ সফল না হলে অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করতে শুরু করে। নজরুল ইঞ্জিনিয়ার এর মতো ব্যক্তিও তাই মেনে নিলেন। তবে তিনি জ্বিনের বিষয়টা বিশ্বাস করলেন না। একটা মোটাতাজা ষাড় কোরবানি করা হলো। এবং আশ্চর্য কথাটি হচ্ছে তারপর আর পিলার ডুবে যায়নি! এখনো সেই কালভার্ট টিকে আছে।এই কাহিনির কারনেই মা আমাকে নিয়ে ভয় পেয়েছেন।
"কে কইছে তোরে রাতের বেলা ঐ অলুক্ষণে যাগায় যাওনের?"
সকালের খাবার খাচ্ছি, সাথে খাচ্ছি মার বকুনি। আলু ভর্তা ভাল হয়েছে, ঝাল কম। কিন্তু বার বকুনিতে এখন ঝাল ঝাল মনে হচ্ছে।
আমি চুপ করে খাচ্ছি। আমার ছোট বোন সবে মাত্র অনার্স কমপ্লিট করেছে। বিজ্ঞান মনষ্ক মেয়ে। আশায় আশায় ওর দিকে তাকালাম। ও চোখ সরু করে গভীর মনোযোগে আমাকে কিছুক্ষন পর্যবেক্ষণ করে বলল,"প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটে সব কিছু জানতে চাওয়া উচিৎ না। There are many things in heaven and earth.-এটা কে বলেছে জানতো?"
আমি বললাম,"শেক্সপিয়ার তো লেখক ছিলেন তিনি যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন। এর সাথে আমার সম্পর্ক কি? আমি তো কিছুই দেখিনি। শুধু শব্দ শুনেছি।"
মা এতোক্ষন আমার দিকে রাগের সহিত তাকিয়ে ছিলেন,"কিছু না দেখলি, শব্দ তো শুনছিলি, তখনই চলে আসলি না কেন?"
আমি কিছু বুঝতে পারছি না। যা আমি দেখিনি তা দেখে কেন ভয় পাবো? আবার আমার কথায় সবাই ভয় পাচ্ছে এবং তারা চাচ্ছে আমিও ভয় পাই! বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং! জোর করে ভয় পাওয়ার চেষ্টা চলছে!
খাওয়া শেষ করে বললাম,"আর যাবো না,ঠিক আছে?"
মা রাগ করেই বললেন,"ঠিক আছে।"
এবার ঘটনাটা খুলে বলি। এটা কোন গল্প না,তাই মিথ্যা বলে আকর্ষণ বাড়িয়ে লাভ নেই। গল্পে চরিত্র থাকে প্রেক্ষাপট থাকে এই ঘটনায় তেমন কোন চরিত্র নেই শুধু প্রেক্ষাপট আছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি। বিদ্যুৎ নেই, প্রচন্ড গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা। চারিদিকে বন্যার পানি থইথই করছে। নদী, নালা, খাল বিলের পানি উপচে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আবহাওয়া সকাল বিকাল পরিবর্তন হচ্ছে। এই ঝুম বৃষ্টি তো এই প্রচন্ড রোদ-এই হচ্ছে অবস্থা।
রাত এখন প্রায় এগারোটা। পল্লী গ্রামে রাত এগারোটা মানে গভীর রাত। কারেন্ট নেই। প্রচন্ড গরমে ঘুম ছুটে গেছে আরো আগেই। এই সময় চাচাতো ভাই বিদেশ থেকে ফোন করলো। এতো রাতে কেউ ফোন করলে বিরক্ত লাগে, আজকে লাগলো না। বরং কিছুটা ভালই লাগলো।বাইরে গিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে আসি। ফোন হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। হাটতে হাটতে কখন কালভার্ট পর্যন্ত চলে এসেছি টের পাইনি। আসার সময় টর্চও নিয়ে আসিনি। কালভার্ট আমার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। কালভার্টের দুই পাশে যতদূর ছোখ যায় শুধু চাষের জমি। এখন অবশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা চাষের জমি। হটাৎ কেউ দেখলে বলে বসবে এটা একটা বিরাট শান্ত নদী! শুধু রাস্তাটা চলে গেছে নদীর মাঝ বরাবর। কালভার্ট পর্যন্ত এসে থমকে দাড়ালাম। প্রকৃতির সৌন্দর্যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। আকাশ হালকা মেঘে ঢাকা। মনে হচ্ছে ক্যানভাসে খুব দক্ষ কোন শিল্পি ছোপ ছোপ রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে। সেই রঙের আবার ছায়া পড়েছে বিলের স্বচ্ছ পানিতে! কি অপার্থিব দৃশ্য। চোখ জুড়িয়ে যায়। সাথে আছে মন জুড়ানো মিষ্টি হিমেল হাওয়া। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না অথচ চারিদিক পরিষ্কার। সাদা কালো মেঘের মাঝে চাদের আলো যে কিরকম দেখতে হায় তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি দুই ধারের প্রায় সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি। এমনকি বিলের ছোট চকচকে মাছ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। কালভার্টের সাথে বেশ কয়েকটা বড় গাছ আছে। গাছের নিচে দাড়িয়ে কথা বলছি।আবছায়া পরিবেশ। চাচাতো ভাইয়ের সাথে কি কথা বলছিলাম কিছুই মনে নেই, শুধু হু হা উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। অল্প সময়েই গরমের ক্লান্তি ভাব চলে গেল।
চারিদিকে ছোখ বুলিয়ে দেখছি। এমন সময় একটা শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা এসেছে আমার পিছনের কালভার্ট থেকে। শব্দ বেশ জোড়ালো। প্রচন্ড শক্তিশালী কোন ষাড় ফোসফোস করলে যেমন শব্দ হয় তেমনি শব্দ। প্রথমে পাত্তা দেইনি। কারন আমি খুব ভাল করেই জানি এই বিলে পোষা ঘোড়া থাকে। এরা সারারাত বিলেই থাকে। কিন্তু একটা সময় পাত্তা দিতে বাধ্য হলাম। কারন শব্দটা এগিয়ে আসছে। ফোনে বিদায় নিলাম চলে যাবো বলে। এতো রাতে কেউ মাছ ধরতে আসার কথা না কারন বর্ষাকালে সাপের ভয় আছে।আর একটা ঘোড়া এই রাতের বেলা আমার ঘাড়ের সামনে চিহিচিহি করবে এটা ভাল লাগবে না।ফোসফোস শব্দের কারনে কিছুটা বিরক্ত হলাম।এতো সুন্দর পরিবেশে বিদঘুটে শব্দটা আমার কাছে শব্দ দূষণ মনে হচ্ছে।
আচমকা মনে পড়লো ঘোড়া ফোসফোস শব্দ করে না, অনেকটা চিহিচিহি শব্দ করে! তাহলে এটা কিসের শব্দ? কারো গোয়াল থেকে কি ষাড় পালিয়েছে?পরক্ষনেই সিদ্ধানটা বাতিল করে দিলাম। এখানে ষাড় আসবে কোত্থেকে। তখন খেয়াল হলো বিলে প্রায় এক মানুষ সমান পানি!
এখন কি আমার ভয় পাওয়া উচিৎ? হ্যা উচিৎ।
কিন্তু আমি অজানা কারনে ভয় পেলাম না, বরং বিরক্ত লাগলো। চারিদিকে প্রায় সবকিছুই দেখা যাচ্ছে, তারপরেও মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বেলে দেখার চেষ্টা করলাম। ফ্লাশ লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন ছিল না, এমনিতেই সবকিছু পরিষ্কার। সামনে এগিয়ে গেলাম শব্দের উৎস খুজতে। শব্দ আমার খুব কাছে হচ্ছে অথচ আমার সামনে টলটলে পানি ছাড়া কিছুই নেই।আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কিছু একটা দেখার জন্য, কিন্তু কিছুই নেই, আছে শুধু প্রচন্ড শক্তিশালী কোন ষাড়ের ফোসফোস শব্দ।
মনে খুব আশা ছিল অপার্থিব কিছু দেখবো। অপার্থিব কোন কিছু চাক্ষুষ করা বিরল সৌভাগ্যের ব্যপার। কিন্তু আমার আশায় গুড়ে বালি। আমি কিছুই দেখতে পাইনি। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর অনেক দূরে কারেন্টের একটা লাইট জ্বলে উঠতে দেখলাম। তার মানে বিদ্যুত চলে এসেছে। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ি চলে এলাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন