নিশি রাতের যাত্রী

জ্যোৎস্না আবৃত বর্ষার রাতের আকাশ। দুই পাশে বিশাল বিলের মাঝ বরাবর চলে গেছে একটি রাস্তা। দূর আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে আবছা সাদা কাঁথার মাঝখানে লম্বা একটি কালো সুতা। গ্রামের সরু রাস্তা তবে পাকা। সামান্য ভাঙাচোরা থাকলেও রাস্তা বেশ ভালো। 

জোসনার আলোয় রাস্তাটি যেমন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তেমন দেখা যাচ্ছে বিলের মাছগুলো৷ বললে হয়তো বিশ্বাস হবে না, বিলের মাছগুলো সাতার কেটে বেড়াচ্ছে যেন তাদের চোখে ঘুম নেই। কিছুদূর পর পর দেখা যাচ্ছে বিলের মাঝে গজিয়ে ওঠা গাছ, গাছগুলোকে পেচিয়ে রেখেছে অনেক ধরনের লতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোৎস্নার আলোয় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বিলের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, দিনের  আলোর তীব্রতা কমিয়ে মৃদু করে দেয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে মৃদু আলোর চাদর, হাত দিলেই ধরা যাবে। 

অপার্থিব এই দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি আমার অটো নিয়ে। যাত্রী পৌঁছে দিতে গিয়ে রাত হয়ে গেছে, এখন ঘড়িতে প্রায় একটা বাজে। রোগী দেখতে গিয়েছিল যাত্রীরা, তাই মানবতার কারনে না করতে পারিনি। মানুষ বিপদে পড়লে সাহায্য করতে হয়। 

চাদের আলোয় হেলতে দুলতে আমার অটো এগিয়ে চলেছে। মানুষ তো দূরের কথা শেয়াল পন্ডিতেরও দেখা নেই। এতো থৈথৈ পানিতে মাছ ছাড়া কিছু থাকারও কথা না। 

হেড লাইটের আলোয় দেখতে পেলাম একজন যুবক হেটে যাচ্ছে রাস্তা ধরে। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা, কাধে ঝোলানো অফিস ব্যাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা চাকরি করে৷ কোন কারনে হয়তো বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। বিশাল বিলের মাঝে বাড়ি ঘর বলতে কিছু নেই। দুই ধারে শুধু বিল আর পানি, আর মাঝে মাঝে দুই একটা ছোট পাকা ব্রিজ। হঠাৎ দুই একটা টং ঘর দেখা যায়, তাও ওগুলো মাছ ধরার জন্য বানানো। গ্রামের মানুষরা নিজেদের ক্ষেতে এসব টং ঘর তৈরি করেছে। বিদ্যুতের বালাই নেই। দিনের বেলায় মাছ ধরে, বড়জোর সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে তাও হারিকেন বা টর্চ লাইট জ্বালিয়ে। তখন টং ঘরগুলো অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। মনে হয় যেন বাতিঘরের ক্ষুদ্র সংস্করণ। 

এসব নির্জন বিলে সবসময় লোক থাকে না, বিশেষ করে এই নিশি রাতে তো প্রশ্নই ওঠে না। 

ব্রেক কষে লোকটার কাছে থেমে জিজ্ঞেস করলাম ভাই কোথায় যাবেন? লোকটি হেসে উত্তর দিলো," ফতেহপুর যাবো।" অনেক সুদর্শন লোকটি। বললাম," ওঠেন।"

নির্জন রাস্তা, নিস্তব্ধতা কাটানোর জন্য লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, " এতো রাতে কোথা থেকে ফিরছেন ভাই?" লোকটি আগের মতো হেসে উত্তর দিলেন," চাকরি করি, গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলাম, হঠাৎ শুনলাম আমার বোন খুব অসুস্থ। তাকে দেখে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেলো।"

তাকে বললাম," এতো রাতে না না ফিরে বোনের বাসায় থাকলেই তো পারতেন। রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভালো না।" 

লোকটি বলল," আমাদের রাতে চলাচল করে অভ্যাস আছে কিছু হবে না।"

"ও, আচ্ছা।" সামনে আগাতে থাকলাম। 

প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখতে দেখতে কখন যে অর্ধেক রাস্তা পারি দিয়ে চলে এসেছি খেয়াল করিনি। 

হঠাৎ বিলের মাঝখানে একটা জঙ্গলের সামনে যাত্রী ভাই দাড়াতে বললেন। আমি কোন কিছু চিন্তাভাবনা না করে ব্রেক কষলাম। প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে অনেকে এরকম করে। লোকটি অটো থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলো, "ভাড়া কতো?"

আমি অবাক হয়ে বললাম," দশ টাকা!"

ভাড়া জিজ্ঞেস করায় অবাক হইনি, অবাক হয়েছি এই জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় দাঁড়িয়ে ভাড়া জিজ্ঞেস করার মানে কী? ডাকাত নয়তো? আআশেপাশে তাকালাম, সাঙ্গপাঙ্গ নাই দেখে আশ্বস্ত হলাম। নির্জন যায়গায় ডাকাতি হলে আগে থেকেই ঝোপঝাড়ে আড়ালে ডাকাত লুকিয়ে থাকবে কিন্তু নিস্তব্ধতা নিরবতা ছাড়া আর কিছুই খুজে পেলাম না।

যুবকের যে স্বাস্থ্য তাতে আমার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে এখানে নামবে? মাথা খারাপ নয়তো? তাই বা হয় কি করে? কথাবার্তা শুনে এরকম মনে হয় না। চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে হাত এগিয়ে টাকা নিলাম, তাকিয়ে দেখি ওটা শেওড়া গাছের পাতা। আমি সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, " ভাই, গাছের পাতা দিচ্ছেন কেন আর আপনি এখানে নামছেন কেন, এটা তো ফতেহপুর না, এখানে তো কোন বাড়িঘরও নেই?" 

লোকটি বললো,"এখান থেকেই ফতেহপুর শুরু আর এখানেই আমার বাড়ি!" বলেই ঝোপের মধ্যে ঝাপ দিলো! ঝোপ ভেঙে পানিতে ঝপাশ করে ভারী বস্তু পরার শব্দ শুনলাম। মূহুর্তেই আমার যাত্রী ভাই গায়েব! ঝোপের ভেতর থেকেই শুনতে পেলাম নাকি গলায় কেউ একজন বলছে, "এতো দেড়ি করলে কেন?" কখন থেকে না খেয়ে বসে আছি, তুমি এলে তবে মাছ ধরে ধরে খাবো।"

প্রথমে কিছুই বুঝলাম না, তারপর শরীরে একটা ঝাকুনি খেলাম। ওরে বাবারে বলেই অটোর পিকাপে দিলাম টান। মটরে ক্যাটক্যাট করে গাড়ি দিলো দৌড়। এভাবে কতক্ষন এসেছি বলতে পারবো না, জ্ঞান ফেরার পর শুধু এটুকু বলতে পারবো ফতেহপুর বাজারের নাইট গার্ডরা আমার মাথায় পানি ঢালছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস