কন্টাক্ট পেপার

হায়দার মিয়া প্রাইমারী স্কুলের গনিতের শিক্ষক। বয়স চল্লিশ পার হয় নাই বটে; তবে কর্ম তাকে পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধ উপাধি দিয়েছে। চুল দাড়ি একটাও কাচা নাই। সারা জীবন পরিশ্রম করে এখন সে ক্লান্ত। হায়দার মাস্টারের সংসারে অভাব দেখা দিয়েছে কদাচিৎ, প্রেসার দিয়েছে ঢের।
কর্মযজ্ঞের দাঁড়িপাল্লা মানুষের উত্থানপতনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়। সেই পাল্লায় কারো ভারী হয় প্রভাব, কারো ভারী হয় অভাব। সে অনুপাতে হায়দার মাস্টারের কর্মে প্রভাবের পাল্লা ভারীই বলা যায়।

কর্মের পাল্লা ভারী হলে তাতে বাটখারাও বেশি লাগে। হায়দার মাস্টার এখন সেই বাটখারা নিয়ে বসেছেন। তিনি এখন নিজ বাড়িতে নিজের ছোট ভাইদের হিসাব নিয়ে মাথা হেট করে বসে আছেন। গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি একই প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বসে আছেন। সবাই হায়দার মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে; তিনি কী বলেন এই আশায়। মাস্টার সাহেব ছাড়া এই রকম গনিতের হিসাব গ্রামের মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না। শত শত বছর ধরে চলে আসা এই হিসাব -যুক্তি তর্ক মানে না, প্রথাগত পদ্ধতিতে এই হিসাব নিষ্পত্তি করতে হয় -এটাই নিয়ম। কিন্তু হায়দার মাস্টার অতীত ছেড়ে বাস্তবে আসতে পারছেন না।

কিছুদিন আগেও তার দুই ভাই সামান্য অজুহাতে গ্রামের মানুষ ডেকে বিচ্ছিরি কাহিনী করেছে। মাস্টার সাহেব লজ্জিত মুখে শুধু একটা কথাই বলেছিল, "একত্রে খেতে ভাল লাগে না -পৃথক হতে চাও, এজন্য গ্রামের মানুষ ডাকার প্রয়োজন কী? আমাকে বললেই তো আমি পৃথক করে দিতাম।"

সুখ দুঃখ যে কারনই হোক না কেন অতীত সবসময় কষ্টদায়ক। হায়দার মাস্টারের অতীত -তার সাক্ষী ও প্রমান দুটোই। চল্লিশ বছরের পুরোটা সময়ই তার অতীত। তিনি মাথা নিচু করে আবছা অতীতকে গারো করার বৃথা চেষ্টা করছেন।

হায়দার মাস্টারের ছোট ভাই রিপন পনের বছর আর সবার ছোটজন স্বপন তার চাইতে প্রায় বিশ বছরের ছোট। তার বাবা মারা গেছেন যখন স্বপনের বয়স মাত্র এক মাস।
তখন থেকে দুই ভাইয়ের অভিভাবক মাস্টার সাহেব। দুই ভাই আর অসুস্থ মায়ের জন্য তিনি অন্যের জমিতে কামলা দিয়েছেন। দুই ভাইয়ের পড়াশুনা, খাওয়া-পরা সব ছিল মাস্টার সাহেবের ঘাড়ে। ওরা শিক্ষিত ছেলে, শিক্ষিত মাত্রই অন্যের বোঝা হতে চায় না। অন্যের ঘাড়ে চেপে বসাকে এক কথায় পরগাছা বলে -এটা ওরা জানে! হায়দার মাস্টার নিজেই তো একথা শিখিয়েছেন তাদের। রিপন আর স্বপন প্রতিষ্ঠিত, দুইজনই ইঞ্জিনিয়ার। থাকে ঢাকায় নিজস্ব ফ্লাটে বউ নিয়ে। তারা এখন জমিজমার ভাগ চাইতে গ্রামে এসেছে।

স্বপন বলল, "আমাদের জমি আমাদের ভাগ করে দেবেন এতে এতো আপত্তি কিসের?"
হায়দার মিয়া চুপ করে আছেন দেখে তারই এক সহযোগী শিক্ষক মোতালেব মাষ্টার বলল, "স্বপন সাব, এই জমি কিন্তু তোমার বাবার সম্পত্তি না, বাড়ী ছাড়া বাদবাকি সব জমি তোমার বড় ভাইয়ের। গ্রামের সব মানুষ এই কথা জানে। তুমিও তো জান- জান না?"

রিপন এবার বলল, "একত্রে থাকতে উনি সব কিছু করেছেন, তাই ভাগে আমরাও সমান অংশ পাই।"
হায়দার মাস্টার এবারও চুপ করে আছে দেখে বয়স্ক একজন বলে বসল, "লোক মুখে শুনি তোমরাও না-কি শহরে বাড়ি করছো, হায়দারকে তার ভাগ দেবে?"

এবার দুই ভাই কিছুটা থতমত খেল। এই গোপন কথাটা তারা ছাড়া আর কেউ জানার কথা না।
এমন সময় হায়দার মাস্টার উঠে দাঁড়ালো, "তোমাদের দুই ভাইকে বাড়ীর তিনভাগের একভাগ সহ আমি আমার সমস্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ দিয়ে দিলাম। আপনারা যারা এখানে আছেন তারা প্রত্যেকে এই কথার সাক্ষী রইলেন।"

-এই টুকু বলেই হায়দার মাস্টার ঘরে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো, খুব ক্লান্ত লাগছে তার।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, রাত হওয়ার আগেই তিনি সব কাজ পুরো করতে চান। এখন তার প্ল্যান করছেন বসে বসে।

কিছুক্ষণ বসে থাকার পর তিনি হেটে চললেন তার বহু দিনের পুরনো বন্ধু ছোট্ট লাইব্রেরীর দিকে। হাতে একটা কন্টাক্ট পেপার। তিনি এখন কন্টাক্ট সাইন করবেন। অনেক কিছু ভাগ করা বাকি আছে তার।

পরদিন সকালবেলা হায়দার মাস্টারের লাইব্রেরীতে নিভে যাওয়া মোমবাতির নিচে চাপা দেয়া একটা কন্টাক্ট পেপার পাওয়া গেল।
অবশ্য এটাকে যদি কন্টাক্ট পেপার বলা যায় তবেই।

"আমি হায়দার মিয়া নিজ হাতে এই কন্টাক্ট পেপার লিখছি। কারো সহযোগীতা বা প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে এই লেখা লিখছি না।"

"ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের কোন কন্টাক্ট হয় না। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থার কারনে এটা করতেই হচ্ছে। বাবা কোন জমিজমা বা টাকা পয়সা রেখে যাননি -এটা তোমরা জানতে। অভাবের কারনে ছোট বেলা থেকেই হাল ধরতে শিখেছি। মাত্র দুইশত চল্লিশ টাকা বেতন পেয়ে তোমাদের মানুষ করা আমার জন্য সহজ ছিল, কিন্তু তোমরা চল্লিশ হাজার টাকা বেতন পেয়ে নিজেদের সন্তান মানুষ করতে পারবে কিনা আমি জানিনা। তোমরা সব কিছুর ভাগ চাইছ, জমিজমা ভাগে আমার কোন আপত্তি নাই। আমি তোমাদের পিতার মতো। সারা জীবন তোমাদের কিছুই দিতে পারিনি, কিন্তু কোলে করে মানুষ করেছি, সব ঝামেলা নিজের কাধে নিয়েছি। সারা জীবন চেষ্টা করলেও সেই কোলে ওঠার মূল্য তোমরা দিতে পারবে না। আমি সেই মূল্য চেয়ে বড় ভাই নামের কলঙ্ক হতে চাই না, ভাইয়ের ভালবাসার কোন ভাগ হয় না, এটা তোমাদের দিয়েছি, এটা শুধু তোমাদের।

আমি হায়দার মিয়া স্বজ্ঞানে স্বেচ্ছায় বাবার রেখে যাওয়া সম্পূর্ণ বাড়ী, আমার সমস্ত সম্পত্তি অর্থাৎ চারশো শতাংশ খেতের জমি, (পুকুর পাড়ের চার শতাংশ জমি বাদে) তোমাদের দুই ভাই রিপন আর স্বপনকে দান করে দিলাম। তোমাদের কাছে আমার কোন চাওয়া নেই, যা-কিছুই কর না কেন শুধু পুকুর পাড়ের চার শতাংশ জমিতে কখনো হাত দিয়ো না। ঐখানে আমাদের পিতা-মাতা আর তোমাদের বড় ভাবী শুয়ে আছে, তাদেরকে বিরক্ত কোর না। তোমরা এই দায়িত্ব পালন করবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।"
                           
                             তোমাদের বড় ভাই
                                   - হায়দার -

কন্টাক্ট পেপার হাতে পাওয়ার পর রিপন আর স্বপন তাদের বড় ভাইকে অনেক খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। নিজের মা মরা সাত বছরের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কোথায় চলে গেছে; তা কেউ জানে না, জানতে পারেনি কোনদিন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস