দুঃখিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
নুরুল মোমেন স্যারকে মনে আছে নিশ্চই? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান? আমার সহপাঠীরা অন্তত তাকে ভুলে যাবে না, তা সে যতবড় এলঝেইমারের রোগীই হোক না কেন!
মানুষ মানুষকে মনে রাখে তার বিশেষ কিছু দোষ বা গুনের কারনে। নুরুল মোমেন স্যারের একটা গুন ছিল- পাগলামি! পৃথিবীতে যতজন মেধাবী জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের সবাইকে আমরা সাধারনরা পাগল বলে ডাকি। কারন তাদের মেধা বুঝতে পারি না, তাই সংক্ষেপে পাগল বলে ডাকাটাই আমাদের কাছে সহজ।
স্যার কী দ্বারা চালিত ছিল আমার জানা নেই; কেননা তাকে আমি কোনদিন রাগ করতে দেখিনি, এমনকি মন খারাপ করতেও দেখিনি।
সদা সহাস্যমুখ স্যার আজকে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। স্যার যখন শেষবার ক্যাম্পাসে এসেছিলেন তখন তিনি বেশ অসুস্থ। তখনো তিনি আমাদের সমস্যা সমাধান করেছেন হাসি মুখে, আর তার গগন বিস্মৃত হাসি উপহার দিয়ে আমাদের বলেছেন, "বিষয়টা আমার মাথায় আছে, তোমরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করো, কোন চিন্তা করো না।"
সেই নুরুল মোমেন স্যারকেও আমি একদিন প্রচন্ড মন খারাপ করতে দেখেছি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায়ে যারা পড়েছেন তারা জানেন আমাদের কোন হল নেই। আসলে হল আছে, কিন্তু সেগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীরা থাকে না অর্থাৎ বেদখল।
তাই ক্লাস মিস হওয়া থেকে শুরু করে পরিক্ষা মিস হওয়াও ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা যারা ছাত্র-ছাত্রী তারা তো বটেই শিক্ষকরা পর্যন্ত পাগল হওয়ার দশা। ছাত্রদের মধ্যে অনেকে বাসের কন্ট্রাক্টর, বাড়ীওয়ালা, এমনকি মেসের গলির নেতাদের হাতে পর্যন্ত নাজেহাল হয়েছে। মেয়েরা নাজেহাল হয়েছে সব থেকে বেশি। প্রথম সেমিস্টারে এরকম সমস্যায় পরতে হয়েছে সবচাইতে বেশিবার।
উপায়ন্তর না দেখে আমরা সবাই নুরুল মোমেন স্যারের কাছে গেলাম। অপরিচিত ঢাকায় তিনিই ছিলেন আমাদের অদৃশ্য অভিভাবক।
খারাপ লাগছে বলতে; তারপরেও বলছি, একজন বাস কন্ট্রাক্টর আমাদের এক শিক্ষার্থীকে বস্তিবাসী বলে গালি দিয়েছে! কারন আমাদের হল নেই!
সেদিন স্যারের মুখে মেঘের মতো কালিমা দেখেছিলাম। হাসি মাখা মুখখানি থেকে হাসি কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। জীবনে ওই একবারই স্যারকে দুঃখিত হতে দেখেছিলাম।
স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিন আমরা কেউ আন্দোলনের নাম পর্যন্ত নেইনি, চুপ করে ছিলাম।
আরেকবার স্যারের অভিভাবকত্ব দেখেছিলাম। আমাদের প্রিয় হাফিজুল ইসলাম স্যারের বাবা মারা যাওয়ার পর। হাফিজ স্যার তার বাবার লাশ কবরে রেখে যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন, তখন নুরুল মোমেন স্যার খুব অসুস্থ ছিলেন। তবুও সেদিন নুরুল মোমেন স্যার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে ক্লাসে এসে বললেন,"আমার হাফিজ কই, হাফিজ, এই হাফিজ!"
ক্লাসে এসে হাফিজ স্যারকে নুরুল মোমেন স্যার জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন। তার সহকর্মীর বাবা মারা গেছেন এজন্য নয়, তার প্রিয় ছাত্র ও সহকর্মীর এতিম হয়ে গেছে এজন্য! পরম মমতায় সেদিন দেখেছিলাম দুজন ভিন্ন মানুষ বাবা সন্তানের মতো একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। এই দৃশ্য আমি কখনোই ভুলতে পারি না।
নুরুল মোমেন স্যার মারা গেছেন, তার মানে এই না তার মৃত্যুর সাথে সাথে শিক্ষাও মারা গেছে। তিনি যে দুঃখ নিয়ে চলে গেছেন সেই দুঃখ আজও আমরা ছাত্র সমাজ বয়ে বেড়াচ্ছি।
আমাদের ঘর আছে, কিন্তু সেই ঘরে বাস করে সাপ, যার ভয়ে আমরা গৃহহারা। সাপ মারতে যাইনি; শুধু বলেছি ঘরটা আমার, তাতেই সাপ ছোবল দিয়েছে।
অধিকার আদায় করতে ৭১ সালে যুদ্ধ করে যদি বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধি পাওয়া যায়, শাহবাগে আন্দোলন করে যদি দ্বিতীয় প্রজন্মের সৈনিক উপাধি পাওয়া যায়, তবে সেই একই অধিকার আদায় করতে চাইলে আমার কেন অন্যায় হবে?
যতোগুলো অধিকার আদায়ের ইতিহাস পড়েছি সব যায়গায় একটা জিনিসই বারবার লক্ষ্য করেছি; পুলিশ জাতিটাই হারামি।
যারা শাসক, দেশ চালায়; আর আমার স্যারের মন খারাপ করে দেয় ;তাদের হাতে যদি অধিকার আদায় করে নেয়ার জোর না থাকে তবে তাদেরকে আমি পরামর্শ দেবো; ছাত্র যদি সাপ মারার জন্য লাঠি ধরা শিখে যায় তবে আপনাদের উচিৎ বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নেয়া!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন