দুই পৃষ্ঠা
জীবনে বহুবার দেশপ্রেম রচনা পড়েছি, লিখেছি কয়েকবার। এতো এতো পড়েও যে জিনিসটি অনুধাবন করতে পারিনি- তার নাম দেশপ্রেম।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠাঃ
গফুর মিয়া আমার প্রতিবেশী, সম্পর্কে দাদা।
বেশ কিছুদিন যাবৎ সে অসুস্থ। কী অসুখ জানিনা, ডাক্তারের মতে উনার পাকস্থলীতে বেশ বড়সড় একটা সমস্যা হয়েছে। অপারেশন না করালে উনি বেশিদিন বাচবেন না। অপারেশন করালেই যে বেচে যাবেন ;তারও কোন নিশ্চয়তা নেই, এই বয়সে অপারেশনের ধকল সহ্য করতে পারবে কি-না, সেটাও একটা প্রশ্ন। অপারেশন মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালেই করা যাবে; কিন্তু সমস্যা আরো একটা আছে, খরচটা সাধ্যের বাইরে, অন্তত গফুর মিয়ার পরিবারের সাধ্যের বাইরে।
টাকা একটা সমস্যা, এটা জানার পরেও সবাই চায় তার আত্মীয় বেচে থাক।
সবাই মিলে শেষ চেষ্টা করে, তা সে যতো কষ্টই হোক আর যতো খরুচেই হোক।
গফুর দাদার বউ সমাজের বিত্তবানদের কাছে হাত পেতেছে, যথাসাধ্য সাহায্য করেছে তারা।
মানুষ সবসময় যথাসাধ্যই সাহায্য করে, কিন্তু সেটা কার যথাযথ আমি জানতে পারিনি।
গফুর মিয়ার পরিবারের কেউ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে সাহায্য চায়নি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এই বিষয়ে তার বউ মানে দাদীর সাথে কথা বলবো। তক্ষুনি রাজু মামার কাছে গেলাম, মামা ঘুমিয়ে ছিলেন- ডেকে তুললাম। তখন রাত দশটা বাজে। গ্রামগঞ্জে রাত দশটা মানে নিশি রাত। মামাকে সব কিছু খুলে বললাম। তিনি বললেন,"সকালে গেলে হয় না?
আমি বললাম, "মামা, লোকটা বেচে থাকতে আমাদের কিছু করা উচিৎ, আগামীকাল যদি সেই সুযোগ না পাই?"
মামা আর কিছু না বলে শার্ট গায়ে চাপিয়ে চললেন আমার সাথে গফুর মিয়ার বাড়ির দিকে।
গফুর মিয়ার বউ জেগেই ছিলেন। তিনি সম্ভবত নামাজে বসে কাঁদছিলেন। তাকে ঘরের বাইরে আসতে বললাম, তার ছেলেদেরকেও ডেকে তুললাম। আমি ইচ্ছে করেই আর কাওকে সাথে আনিনি। এখানে লজ্জাসংকোচের একটা বিষয় আছে।
মুখে যে যতো কথাই বলুক সাহায্যের টাকা গ্রহন করা সোজা কথা নয়। সংকোচ একটা বিশাল সমস্যা, আবার সমাধানও বটে।
তার ছেলেদের বললাম," চাচা আমি যদি গ্রাম থেকে টাকা তুলে দেই তোমরা কি তা নেবে।"
বড় ছেলে বলল, "চাচা, আমাগো খবর তো তোমার জানাই আছে, তিনটা ভাই আমরা; বেবাকেই ঘরে বসা, কামাই নাই এক টাকা।"
গফুর দাদার বউ বলল, "বাই, আমি ভাবতাছি কাইল থেইকা স্কুলে স্কুলে জামু। গ্রামের কয়েক জনরে কইছিলাম, তারা বেবাকে ব্যস্ত মানুষ। তোমরা সাহায্য করলে আমার আসমান সমান উপকার হয়।"
কথা বলার আর কিছু নেই, অনুমতি যেহেতু পাওয়া গেছে; সাহায্য চাইতে আর কোন সমস্যা নেই।
পরদিন সকাল -সকাল রাজু মামা সহ আরো কয়েকজন যুবককে একত্র করলাম। তারা আগ্রহ ভরে আমাদের সাথে সারাদিন ঘুরেঘুরে টাকা সংগ্রহ করতে লাগলো। কাজটা করে খুব শান্তি পেলাম। এবার টাকা হিসাবের পালা।
সারাদিন পরিশ্রম শেষে টাকা গুনতে বসলাম, মাত্র সাত হাজার টাকা তুলেছি। এতো বড় একটা গ্রাম, কতো বড় বড় তার মানুষ, অথচ টাকা উঠেছে মাত্র সাত হাজার। যে প্রশান্তি নিয়ে গ্রামে বেড়িয়েছিলাম তার কিছুই অবশিষ্ট রইলো না।
তবে সাইদুল কাকা খুব খুশি হয়েছে। খুশির কারন আছে, তার জানামতে এই গ্রামে কারো চিকিৎসার জন্য উত্তলিত এটাই সর্বোচ্চ টাকা! এর আগে এতো টাকা কোন দিন ওঠেনি!
প্রথম পৃষ্ঠাঃ
পাড়া গ্রামে কোন অনুষ্ঠানের নাম নিলেই গ্রামের মানুষ খুশিতে ফেটে পরে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাদ দিলে গ্রামে সব চাইতে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সে রকম একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। শিল্পী আসবে ঢাকা থেকে, উদ্বোধন করবেন স্বয়ং এম,পি নিজে! আর তাছড়া আমাদের গ্রামের একটা সুনাম আছে। লোক মুখে শুনি আমাদের চাইতে আশে পাশে নাকি আর কোন গ্রাম এতো ভালো অনুষ্ঠান করতে পারে না। চাই সে খেলাধুলা, অনুষ্ঠান বা কোন উন্নয়নমূলক কাজ। শুনতে খুব ভালো লাগে এসব কথা।
অনুষ্ঠানের চিন্তাটা কারো মাথায় আসেনি; হুট করে মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেছে। সাধারন একটা মাসিক মিটিং-এ একজন বলল অনেক দিন কোন বিনোদন হয় না, সামান্য সাংস্কৃতিক কিছু আয়োজন না করলে তো আর গ্রামের মান ইজ্জত থাকে না। বলা শেষ হয়নি তক্ষুনি এক বিদেশ ফেরৎ ব্যক্তি বলে উঠলো "আমি দশ হাজার দেবো।" আরেক জন বলল, "যদি গান বাজনার ব্যবস্থা থাকে তবে আমি দেবো আট হাজার, না থাকলে একটাকাও দেবো না।"
মুহূর্তেই মিটিং-এর ভোল পালটে গেলো, বলতে না বলতেই প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা উঠে গেলো, ব্যস শুরু হয়ে গেলো আয়োজনের ব্যস্ততা, শুরু হয়ে গেলো দৌড়ঝাঁপ। গ্রামের প্রত্যেকেই এখন ব্যস্ত। অনুষ্ঠান হবে প্রাইমারী স্কুলের মাঠ প্রাঙ্গণে। যথারীতি প্যান্ডেল করা হলো, মঞ্চ তৈরি হলো, সভাপতির আসত তৈরি হলো, বিশেষ অতিথির আসন তৈরি হলো, আলোকসজ্জা করা হলো, কার্ড বিতরন করা হলো, মাইকিং করা হলো, সে এক হুলস্থুল ব্যাপার। যাহোক শেষ পর্যন্ত আয়োজন সমাপ্ত হলো, এখন অনুষ্ঠান শুরুর পালা।
গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ছে, চারিদিকে হৈচৈ- চিৎকার- চেঁচামেচি, সবই আনন্দের উল্লাস। আশেপাশের গ্রাম থেকেও মানুষজন আসছে । যেভাবে পিপীলিকার মতো সার বেধে আসছে এখন জায়গা সংকুলান হলেই গ্রামের ইজ্জত রক্ষা হয়।
ক্ষণ গুনতে গুনতে অবশেষে শুরু হলো বহুল প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমে ক্লাবের সভাপতি শুরু করলেন, তারপর এম,পি। একে একে সবার যখন বক্তব্য শেষ, তখন শুরু হলো গানের অনুষ্ঠান। সভাপতি অনুরোধ করলেন প্রথমে একটা দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জন্য। শিল্পি শুরু করলেন জনপ্রিয় একটা দেশাত্মবোধক গান, "ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা..........।"
কন্ঠ আহামরি কিছু না, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, জনতা মজা পেতে এসেছে এবং তারা মজা পাচ্ছেও। মাঝখানে একটা গুঞ্জন উঠেছিল কেউ একজন শিল্পি আর প্যান্ডেল করার টাকা মেরে দিয়েছে। সেই হিসাব না-কি পাওয়া যাচ্ছে না। এখন সেই গুঞ্জনের বালাই নেই। গানের সুরে সব ভেসে গেছে।
সবাই মজা পাচ্ছে, কিন্তু আমি মজা পাচ্ছি না। সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে আমি বেশ প্রফুল্ল চিত্তেই থাকি, কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন।
কাউকে কিছু না বলে চুপ করে মাঠ থেকে বেড়িয়ে এলাম, গানে গানে মুখরিত আনন্দের জোয়ার আমার কানে কান্নার মতো শোনাচ্ছে। ঘুরেফিরে গফুর দাদার কথাই মনে হচ্ছে বারবার। তিনি মারা গেছেন অল্প কিছুদিন হলো। টাকার সংকুলান না হওয়ায় তার মৃত্যু দ্রুত এসে দেখা করে গেছে।
আমরা মানুষ, আমাদের এটা চিন্তা করাই স্বাভাবিক যে, হয়তো অপারেশন করাতে পারলে তিনি বেচে থাকতেন। মৃত্যুর উপরে কারো হাত নেই এটা যেমন ধ্রুব সত্য; তেমনি মৃত্যু দ্রুত করার পিছনে মানুষের হাত আছে -এটাও সত্য।
মাঠ থেকে বেড়িয়ে নদীর মোড়ে এসেছি এমন সময় রাজু মামাকে দেখলাম, রেগে লাল হয়ে আছে, হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। গুম মেরে বসে আছে উপড়ে পরা একটা আম গাছে গুঁড়িতে। আমি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মামা এতো সুন্দর দেশাত্মবোধক গান হচ্ছে আর আপনি এখানে বসে আছেন?"
মামা বলল, "রাখ তোর দেশাত্মবোধক গান, গ্রামের একজন অসহায়রে সাহায্য করার মুরাদ নাই, আবার দেশাত্মবোধক গান ফুটাইছে! ঐরকম দেশপ্রেম পকেটে থুইয়া দিতে ক, রবিবারের হাটে বেচলে টাকা পাইবো!"
এতো দূর থেকেও আমি তখনো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি লাউড স্পিকারে বেজে চলেছে দেশাত্মবোধক গান "ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা..............।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠাঃ
গফুর মিয়া আমার প্রতিবেশী, সম্পর্কে দাদা।
বেশ কিছুদিন যাবৎ সে অসুস্থ। কী অসুখ জানিনা, ডাক্তারের মতে উনার পাকস্থলীতে বেশ বড়সড় একটা সমস্যা হয়েছে। অপারেশন না করালে উনি বেশিদিন বাচবেন না। অপারেশন করালেই যে বেচে যাবেন ;তারও কোন নিশ্চয়তা নেই, এই বয়সে অপারেশনের ধকল সহ্য করতে পারবে কি-না, সেটাও একটা প্রশ্ন। অপারেশন মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালেই করা যাবে; কিন্তু সমস্যা আরো একটা আছে, খরচটা সাধ্যের বাইরে, অন্তত গফুর মিয়ার পরিবারের সাধ্যের বাইরে।
টাকা একটা সমস্যা, এটা জানার পরেও সবাই চায় তার আত্মীয় বেচে থাক।
সবাই মিলে শেষ চেষ্টা করে, তা সে যতো কষ্টই হোক আর যতো খরুচেই হোক।
গফুর দাদার বউ সমাজের বিত্তবানদের কাছে হাত পেতেছে, যথাসাধ্য সাহায্য করেছে তারা।
মানুষ সবসময় যথাসাধ্যই সাহায্য করে, কিন্তু সেটা কার যথাযথ আমি জানতে পারিনি।
গফুর মিয়ার পরিবারের কেউ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে সাহায্য চায়নি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এই বিষয়ে তার বউ মানে দাদীর সাথে কথা বলবো। তক্ষুনি রাজু মামার কাছে গেলাম, মামা ঘুমিয়ে ছিলেন- ডেকে তুললাম। তখন রাত দশটা বাজে। গ্রামগঞ্জে রাত দশটা মানে নিশি রাত। মামাকে সব কিছু খুলে বললাম। তিনি বললেন,"সকালে গেলে হয় না?
আমি বললাম, "মামা, লোকটা বেচে থাকতে আমাদের কিছু করা উচিৎ, আগামীকাল যদি সেই সুযোগ না পাই?"
মামা আর কিছু না বলে শার্ট গায়ে চাপিয়ে চললেন আমার সাথে গফুর মিয়ার বাড়ির দিকে।
গফুর মিয়ার বউ জেগেই ছিলেন। তিনি সম্ভবত নামাজে বসে কাঁদছিলেন। তাকে ঘরের বাইরে আসতে বললাম, তার ছেলেদেরকেও ডেকে তুললাম। আমি ইচ্ছে করেই আর কাওকে সাথে আনিনি। এখানে লজ্জাসংকোচের একটা বিষয় আছে।
মুখে যে যতো কথাই বলুক সাহায্যের টাকা গ্রহন করা সোজা কথা নয়। সংকোচ একটা বিশাল সমস্যা, আবার সমাধানও বটে।
তার ছেলেদের বললাম," চাচা আমি যদি গ্রাম থেকে টাকা তুলে দেই তোমরা কি তা নেবে।"
বড় ছেলে বলল, "চাচা, আমাগো খবর তো তোমার জানাই আছে, তিনটা ভাই আমরা; বেবাকেই ঘরে বসা, কামাই নাই এক টাকা।"
গফুর দাদার বউ বলল, "বাই, আমি ভাবতাছি কাইল থেইকা স্কুলে স্কুলে জামু। গ্রামের কয়েক জনরে কইছিলাম, তারা বেবাকে ব্যস্ত মানুষ। তোমরা সাহায্য করলে আমার আসমান সমান উপকার হয়।"
কথা বলার আর কিছু নেই, অনুমতি যেহেতু পাওয়া গেছে; সাহায্য চাইতে আর কোন সমস্যা নেই।
পরদিন সকাল -সকাল রাজু মামা সহ আরো কয়েকজন যুবককে একত্র করলাম। তারা আগ্রহ ভরে আমাদের সাথে সারাদিন ঘুরেঘুরে টাকা সংগ্রহ করতে লাগলো। কাজটা করে খুব শান্তি পেলাম। এবার টাকা হিসাবের পালা।
সারাদিন পরিশ্রম শেষে টাকা গুনতে বসলাম, মাত্র সাত হাজার টাকা তুলেছি। এতো বড় একটা গ্রাম, কতো বড় বড় তার মানুষ, অথচ টাকা উঠেছে মাত্র সাত হাজার। যে প্রশান্তি নিয়ে গ্রামে বেড়িয়েছিলাম তার কিছুই অবশিষ্ট রইলো না।
তবে সাইদুল কাকা খুব খুশি হয়েছে। খুশির কারন আছে, তার জানামতে এই গ্রামে কারো চিকিৎসার জন্য উত্তলিত এটাই সর্বোচ্চ টাকা! এর আগে এতো টাকা কোন দিন ওঠেনি!
প্রথম পৃষ্ঠাঃ
পাড়া গ্রামে কোন অনুষ্ঠানের নাম নিলেই গ্রামের মানুষ খুশিতে ফেটে পরে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাদ দিলে গ্রামে সব চাইতে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সে রকম একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। শিল্পী আসবে ঢাকা থেকে, উদ্বোধন করবেন স্বয়ং এম,পি নিজে! আর তাছড়া আমাদের গ্রামের একটা সুনাম আছে। লোক মুখে শুনি আমাদের চাইতে আশে পাশে নাকি আর কোন গ্রাম এতো ভালো অনুষ্ঠান করতে পারে না। চাই সে খেলাধুলা, অনুষ্ঠান বা কোন উন্নয়নমূলক কাজ। শুনতে খুব ভালো লাগে এসব কথা।
অনুষ্ঠানের চিন্তাটা কারো মাথায় আসেনি; হুট করে মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেছে। সাধারন একটা মাসিক মিটিং-এ একজন বলল অনেক দিন কোন বিনোদন হয় না, সামান্য সাংস্কৃতিক কিছু আয়োজন না করলে তো আর গ্রামের মান ইজ্জত থাকে না। বলা শেষ হয়নি তক্ষুনি এক বিদেশ ফেরৎ ব্যক্তি বলে উঠলো "আমি দশ হাজার দেবো।" আরেক জন বলল, "যদি গান বাজনার ব্যবস্থা থাকে তবে আমি দেবো আট হাজার, না থাকলে একটাকাও দেবো না।"
মুহূর্তেই মিটিং-এর ভোল পালটে গেলো, বলতে না বলতেই প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা উঠে গেলো, ব্যস শুরু হয়ে গেলো আয়োজনের ব্যস্ততা, শুরু হয়ে গেলো দৌড়ঝাঁপ। গ্রামের প্রত্যেকেই এখন ব্যস্ত। অনুষ্ঠান হবে প্রাইমারী স্কুলের মাঠ প্রাঙ্গণে। যথারীতি প্যান্ডেল করা হলো, মঞ্চ তৈরি হলো, সভাপতির আসত তৈরি হলো, বিশেষ অতিথির আসন তৈরি হলো, আলোকসজ্জা করা হলো, কার্ড বিতরন করা হলো, মাইকিং করা হলো, সে এক হুলস্থুল ব্যাপার। যাহোক শেষ পর্যন্ত আয়োজন সমাপ্ত হলো, এখন অনুষ্ঠান শুরুর পালা।
গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ছে, চারিদিকে হৈচৈ- চিৎকার- চেঁচামেচি, সবই আনন্দের উল্লাস। আশেপাশের গ্রাম থেকেও মানুষজন আসছে । যেভাবে পিপীলিকার মতো সার বেধে আসছে এখন জায়গা সংকুলান হলেই গ্রামের ইজ্জত রক্ষা হয়।
ক্ষণ গুনতে গুনতে অবশেষে শুরু হলো বহুল প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমে ক্লাবের সভাপতি শুরু করলেন, তারপর এম,পি। একে একে সবার যখন বক্তব্য শেষ, তখন শুরু হলো গানের অনুষ্ঠান। সভাপতি অনুরোধ করলেন প্রথমে একটা দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জন্য। শিল্পি শুরু করলেন জনপ্রিয় একটা দেশাত্মবোধক গান, "ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা..........।"
কন্ঠ আহামরি কিছু না, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, জনতা মজা পেতে এসেছে এবং তারা মজা পাচ্ছেও। মাঝখানে একটা গুঞ্জন উঠেছিল কেউ একজন শিল্পি আর প্যান্ডেল করার টাকা মেরে দিয়েছে। সেই হিসাব না-কি পাওয়া যাচ্ছে না। এখন সেই গুঞ্জনের বালাই নেই। গানের সুরে সব ভেসে গেছে।
সবাই মজা পাচ্ছে, কিন্তু আমি মজা পাচ্ছি না। সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে আমি বেশ প্রফুল্ল চিত্তেই থাকি, কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন।
কাউকে কিছু না বলে চুপ করে মাঠ থেকে বেড়িয়ে এলাম, গানে গানে মুখরিত আনন্দের জোয়ার আমার কানে কান্নার মতো শোনাচ্ছে। ঘুরেফিরে গফুর দাদার কথাই মনে হচ্ছে বারবার। তিনি মারা গেছেন অল্প কিছুদিন হলো। টাকার সংকুলান না হওয়ায় তার মৃত্যু দ্রুত এসে দেখা করে গেছে।
আমরা মানুষ, আমাদের এটা চিন্তা করাই স্বাভাবিক যে, হয়তো অপারেশন করাতে পারলে তিনি বেচে থাকতেন। মৃত্যুর উপরে কারো হাত নেই এটা যেমন ধ্রুব সত্য; তেমনি মৃত্যু দ্রুত করার পিছনে মানুষের হাত আছে -এটাও সত্য।
মাঠ থেকে বেড়িয়ে নদীর মোড়ে এসেছি এমন সময় রাজু মামাকে দেখলাম, রেগে লাল হয়ে আছে, হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। গুম মেরে বসে আছে উপড়ে পরা একটা আম গাছে গুঁড়িতে। আমি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মামা এতো সুন্দর দেশাত্মবোধক গান হচ্ছে আর আপনি এখানে বসে আছেন?"
মামা বলল, "রাখ তোর দেশাত্মবোধক গান, গ্রামের একজন অসহায়রে সাহায্য করার মুরাদ নাই, আবার দেশাত্মবোধক গান ফুটাইছে! ঐরকম দেশপ্রেম পকেটে থুইয়া দিতে ক, রবিবারের হাটে বেচলে টাকা পাইবো!"
এতো দূর থেকেও আমি তখনো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি লাউড স্পিকারে বেজে চলেছে দেশাত্মবোধক গান "ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা..............।
আসল দেশ প্রেমী নাই / সব ভন্ড দেশ প্রেমীী
উত্তরমুছুনঠিক বলেছেন
মুছুনদেশ প্রেম শব্দটি একটি পবিত্র শব্দ যা সবার মুখে মানাই না। আপনার আমার সবার হৃদয়ে যদি ১০০% দেশ প্রেম থাকে তাহলে কখনো এদেশে দুর্নীতির কালো হাত ছোবল দিতে পারবে না।
উত্তরমুছুনসত্য কথা
মুছুন