নক্ষত্র

একঃ
রাত আর দিনের মধ্যে পার্থক্য কী?
আমি তো এক সূর্য ছাড়া আর কোন কিছুর পার্থক্য দিন আর রাতের মধ্যে দেখি না।রাতে সবই তো দিনের মতোই থাকে,তারপরেও মানুষ রাতে ভয় পায় কেন?
একটা মাত্র জিনিসের অভাব পুরো দুনিয়ার চেহারাটাই পাল্টে দেয় তাই না! ভেবে অবাক হতে হয়।

রাতের চাঁদ কত উপকথার জন্ম দিয়েছে তার হিসাব নাই।অথচ সূর্য চাদের চাইতে কত বেশি উপকার করেছে দুনিয়ার-কে রাখে তার খবর।না চাইতে যা পাওয়া যায় তার কদর খুব কম লোকেই করে, যদিও তার মূল্য কোন কিছু দ্বারাই করা কারো পক্ষেই সম্ভবপর হয় নাই।

রাত একটা অদ্ভুত সৃষ্টি।সব শ্রেনীর মানুষের জন্য রাত একটি নিদর্শন।সাধারণ মানুষের জন্য আরামের নিদর্শন,প্রেত সাধকের জন্য সাধনার নিদর্শন,চোরের জন্য সুযোগের নিদর্শন, এবাদতকারীর জন্য স্রষ্টার কাছাকাছি পৌঁছানোর নিদর্শন।এতো নিদর্শন থাকা সত্যেও সূর্য যখন উদিত হয় তখন সব নিদর্শন বাস্তবতার ছোয়া পেতে উদগ্রীব হয়ে পরে।

দিন মানুষের স্বপ্ন পূরণ করে কিন্তু রাত যে স্বপ্ন দেখায় তা কেউ বলে না।
দিন আশার প্রতিক আর রাত আশা জাগানোর প্রতিক।দিন যাদের কাছে নিরাশার প্রতিক তারা রাতে অন্তত ঘুমের ঘোরে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে,কিন্তু যারা সবল?
আচ্ছা সূর্যের চাইতেও কী সবল কোন আলোকপিন্ড আছে সারা জাহানে?
আছে হয়তো কোন নক্ষত্র, কে রাখে তার খবর।

দুইঃ
রমজান মাস, সংযমের মাস।ইচ্ছা হলেও এই মাসে মুসলমান অনেক কিছু করতে পারে না।যারা সারা বছর যাকাত ফাঁকি দেয় তারাও এই মাসে ফিৎরা আদায় করতে ভুল করে না।সারা জীবনের সব ফিৎরা তারা একবারে আদায় করতে চায়!
মৃত্যুপথযাত্রী কোন ব্যক্তিকে যারা কোনদিন দেখতে যায়নি, কিছু দান করেনি, অথচ শেষ বিদায়ের দিন আবেগের বশবর্তী হয়ে একটু শেষ দেখা দেখতে যায় শুধুমাত্র দাঁড়িপাল্লা ভারি করতে ;তারাও ফিৎরা আদায় করতে দুবার ভাবে না।
এই ফিৎরার টাকাই হয়তো হযরত মিয়ার বউয়ের ঈদের যোগান।কিন্তু আজকাল মানুষ টাকার পরিবর্তে কাপড় দেয়া শুরু করেছে।হযরত মিয়ার বউ বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে।তার সামনে পাঁচটা কাপড়,পুরনো বিছানা জুড়ে নতুন কাপড়ের বাজার!
"পুরাতন কাপড় ধুয়ে পরা যায় কিন্তু পচা খাবার কী ধুয়ে খাওয়া যায়?তাহলে ইফতার কী কাপড় দিয়ে করবো?
নাহ!  তা মনে হয় করতে হবে না।ঘরে মুরগীর ডিম আছে,ডিম দিয়ে ইফতার করলে কেউ না করবে না,প্রত্যেকদিন তো তাই করছি।আরেকটা কাজ করা যায়,ডিম বিক্রি করা যায়,তাতে যদি কিছু পয়সা হয় তবে হয়তো কিছু ইফতার পাওয়া যাবে।"-এগুলো ষাট বছর বয়স্কা  হযরত মিয়ার বউয়ের মনের ভাবনা।

টাকার অভাবই দারিদ্র্যে নয়-এটা হযরত মিয়ার বউ খুব ভালো করে জানে কিন্তু বলবে কার কাছে?
আমরা তো আধুনিক মানুষ, বন্ধুর অভাব নাই,কিছু হলেই ফেসবুকে দুঃখের বাধ ভেঙে,পুরনো শব্দের নতুন অর্থ করে দেই কিন্তু হযরত মিয়ার বউয়ের ভাবনা ব্যতিত কোন উপায় নাই,তার কথা শোনার মতো দুনিয়াতে কেউ নাই।ছেলে সন্তান কখনোই তার ছিল না,বৃদ্ধ হযরত মিয়া মরে গিয়ে বউকে করে গেছে একলা।ভাংগা ঘরের বেড়ায় আবৃত ভাবনাই এখন তার দুনিয়ার একমাত্র সম্বল।

মসজিদে আছরের আজান হচ্ছে,তার মানে এখন সবাই ইফতারের জন্য প্রস্তুতি শুরু করবে।হযরত মিয়ার বউ নামাজ শেষ করে একটা কাপড় আর পাঁচটা ডিম নিয়ে গ্রামে বেড়িয়ে পড়লো।
বেড়িয়ে পরাটা সহজ কিন্তু কার্য উদ্ধার করা এতো সহজ না।ষাট বছর বয়সটাই তার কাছে একটা অভিধান।সেখানে খুব ভালো করেই মানব চরিত্রের সংজ্ঞা দেয়া আছে।

ডিম বিক্রি করা সহজ কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই বলে "হাতে টাকা নাই,এখন দিতে পারবো না।"
তার মানে আজকেও ইফতারের স্বাদ পাওয়া যাবে না!
হাত পেতে কারো কাছ থেকে কিছু নেয়া হযরত মিয়ার বউয়ের চরিত্রে নেই।
শেষ পর্যন্ত হাত পাততে হলো না অবশ্য।সংখায় কম হলেও মানুষ আছেতো দুনিয়াতে নাকি!

টাকা কিছু পেয়েছে হযরত মিয়ার বউ,দুই টাকা কম হলেও কিছু এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।
দুটো কাজ নিয়ে বেড়িয়েছিল হযরত মিয়ার বউ,একটা কাজ বাকী আছে এখনো।
হাটতে হাটতে হযরত মিয়ার বউ গ্রামের সব চাইতে দরিদ্রের ঘরে এসে পৌছেছে।বাইরে থেকে ডাক দিলেন,"ও ইসমতের মা বাড়ি আছো নাকি?"
ইসমতের মা ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে।হযরত মিয়ার বউ তার হাতে কাপড় তুলে দিয়ে বলে, "আমি আমার ফিৎরা আদায় করলাম।"

বড়লোক বড়লোককে সাহায্য করে গরীব করে গরীবকে সাহায্য। নক্ষত্রের দিকে চায় নক্ষত্র,চাঁদের দিকে চাঁদ,মানুষের দিকে মানুষ চায় আর ভিক্ষুকের দিকে গরীবের হাত!

কাপড় বিক্রি করলে আরো বেশি টাকা পাওয়া যেতো কিন্তু এটা সংযমের মাস,ইচ্ছা করলেও মুসলমান সব কিছু করতে পারে না।
সব আদায় শেষ এখন তার কাজ পাচ টাকার মুড়ি কিনে ঘরে ফেরা।প্রত্যেকদিন ভাতের সাথে ডিম সেদ্ধ খেতে ভালো লাগে না।মুড়ির সাথে সেদ্ধ ডিম খেতে কী খুব খারাপ লাগবে?মনে হয় না।হযরত মিয়ার বউয়ের মুখে ইসমতের মায়ের ঈদের মৃদু হাসি,ইফতারের আর বেশি সময় বাকী নেই!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস