হায়েনা



  আমার গ্রাম; খুব মিষ্টি একটা গ্রাম। ছায়াঘন কুটিরের সাথে এর তুলনা চলে। পুরো গ্রাম নদীর পাড় ঘেষে গড়ে উঠেছে, নদীর বাঁকে কাশফুল। দেখে বোঝার উপায় নেই সাজানো- গোছানো গ্রামটি হায়েনার অভয়ারণ্য!
আমার গ্রামের হায়েনারা সিজনাল হায়েনা। কোরবানির ঈদ আর শালিসে এদের উদয় হয় সবচাইতে বেশি।

  হায়েনা সব চাইতে বিখ্যাত অন্যের  শিকার চুরি করে খাওয়ার জন্য। শিকারিকে এক পাল হায়েনা বিরক্ত করে, অন্য পাল সেই ফাকে শিকার চুরি করে।

প্রথম খন্ডঃ

  আমার ফুপা আর ফুপুর মধ্যে তুমুল বিরোধ চলছে। বিরোধ এতোটাই গুরুতর যে গ্রামের মতব্বরেরা  সমাধান করতে পারছে না।
বিচারে এক মাতব্বর এক পাল্লা ভারী করেন তো আরেক মাতব্বর অন্য পাল্লায় চেপে বসেন। মাসের পর মাস ধরে চলে বিচার, কিন্তু শেষ হয় না।

  আসল সমস্যা তারা দুজনেই মালদার পার্টি। মালদার একজন হলে এক তুড়িতেই সমস্যা সমাধান করা যেতো, কিন্তু ভিলেজ পলিটিক্স এতো সোজা কথা নয়।

  চেয়ারম্যান মিথ্যা সাক্ষী দেখতে দেখতে মাফ চাইতে বাধ্য হয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত তারা দুজনেই গেছেন পুলিশের কাছে "বিচার" চাইতে।

দ্বিতীয় খন্ডঃ

  আমাদের থানায় দুজন এস,আই। তাদের নাম জানিনা, তবে চিনি। তাদের কাজ আর সব পুলিশের মতোই-"আপরাধ" দমন করা।

  ফুপুর অভিযোগ, "আমার স্বামী লোক ভালো না, সে রাতে বাড়িতে থাকে না, অন্য মেয়ে মানুষ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, প্রায়ই আমাকে মারধোর করে। এই যে দেখুন," -বলে হাতের কাটা  দাগ দেখিয়ে দিলো।
"এবার আমার যৌতুকের টাকা ফেরৎ দিতে বলুন, আমি আর ওর সাথে সংসার করবো না।"

  ফুপুর নিজের দোষ বাদ দিলে অভিযোগ সত্য।

  ফুপার অভিযোগ, "আমার বউ আমার কথা শোনে না, আমার মা-বাবার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে। তারপরেও আমি তাকে তালাক দেবো না, টাকা দেয়ার-তো প্রশ্নই ওঠে না।"

  ফুপার অভিযোগ সত্য।তবে তিনি যৌতুকের  টাকার লোভে বউকে তালাক দিতে চায় না-এইটা গোপন রেখেছেন।
কথা গোপন করা কোন বিষয় না। পুলিশ ফুপার অভিযোগ নিয়েছে।

  এইবার সেই মহিলার অভিযোগ,   যাকে নিয়ে ফুপা ঘুরে বেড়ায়। তিনি আর কেউ নন, আমার ফুপুর আপন ভাবি, মানে তার বড় ভাইয়ের বউ! তিনি অবস্থা বেগতিক দেখে জেলা সদর থানায় অভিযোগ করেছেন।

  তার অভিযোগ, তার স্বামী; মানে আমার ফুপুর ভাই বিদেশে থাকেন, কিন্তু কোন টাকা পয়সা দেন না। তাই ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বাধ্য হয়ে নিজের ননদের জামাইয়ের কাছে কয়েকদিন গেছেন টাকা ধার চাইতে।

  তিনি টাকার জন্যে ননদের স্বামীর কাছে গেছেন-এইটা সত্য কিন্তু শুধু টাকার জন্য গেছেন-এইটা মিথ্যা।তবে পুলিশ অভিযোগ নিয়েছে।

  ত্রিমুখী অভিযোগ শেষ।এবার কর্তা বাদ দিয়ে ক্রিয়াতে চলে আসি।

  ফুপু তার এস,আইকে দশ হাজার টাকা দিয়েছে। সাথে বলে দিয়েছে, "যেভাবে পারেন আমার স্বামী আর ভাবিকে ধরে এনে পিটান। টাকা আরো লাগলে আরো দেবো।"
পুলিশ তাকে আশ্বাস দিয়েছে, "কোন চিন্তা করবেন না।"

  ফুপুর ভাবি দিয়েছে দশ হাজার, "আমার স্বামী আর ননদকে ইচ্ছা মতো পিটিয়ে মোবাইলে ভিডিও করে আমাকে দেখাবেন। টাকা আরো দেবো।"
পুলিশ তাকে আশ্বাস দিয়েছে, "সময়মত সব হবে।"

  ফুপার এস,আই ফুপাকে বলেছে, "নারী নির্যাতন মামলা, বোঝেনই তো অবস্থা সুবিধার না।"
ফুপা দিয়েছে বিশ হাজার, "স্যার একটু আগে খবর দিয়েন। তার পর আমি আছি।"

  ফুপু দুদিন পর তার এস,আইকে ফোন করেছে, "আমার স্বামী বাজারে আছে, যত দ্রুত পারেন চলে আসেন, নইলে ধরতে পারবেন না!"

  এস, আই মাত্র সাড়ে চার মিনিটে চলে এসেছে। কিন্তু ফুবা বাবাজী স্রেফ উধাও!

ফুপার এস, আই কচু খায় না, টাকা খায়।
তিনিও ফোন করেছেন তার সহকর্মী বেড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে।
"বাবাজী, তিন মিনিট সময় দিলাম, ভাগো।"

জেলা সদর থানার এস,আই এসেছেন  দশ মিনিটের মাথায়, ফাকা মাঠে গোল দিয়ে গেছেন! কারন মোবাইল নামক বস্তুটা সবখানে আছে,আর মোবাইল শুধু মানুষ-ই চালায় না!





মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস