ক্যান্সার

                মোঃসিফাত হোসেন
২৬ শে-মার্চ ২০১৪-এইদিন জাতীয় সংগীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড করা হয়েছে।আগের দিন অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ রাতে অনেকে এই বিষয়টা নিয়ে ফেসবুকে সুন্দর সুন্দর পোস্ট দিয়েছে।কত সুন্দর করে লেখা একেক জনের সেই ভাষা, ভবিষ্যতে আরো কত কিছু করার স্বপ্ন সেই ভাষায়!

একজন লিখেছে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আমরা একসাথে জাতীয় সংগীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গরবো!কত গর্ব তার।
যে পোস্ট দিয়েছে তাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি।সে ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল,এখন ডাক্তার,নাম বলা যাবেনা,কারন ও আমার বন্ধু।টিচার বা ছাত্র-ছাত্রী সবাই তাকে এক ডাকে ক্লাসের সবচাইতে মেধাবী বালক নামে চেনে।

 আজকাল ভাল রেজাল্ট কে মেধা বলা হচ্ছে।গোল্ডেন এ প্লাস মানে ছেলেও গোল্ড।
ঐ ছেলে যদি মেধাবী হয়ে থাকে তাহলে ২৬ শে মার্চকে বিজয় দিবস বলছে কেন?
জানেনা বলে?নাকি ভুলে গেছে?
ভুল সব প্রানিই করে,ভুল বুঝতে পারে কেবল মানুষ।তবে সব কিছু ভুল হতে পারেনা, কিছু হচ্ছে ভুল নামের অজ্ঞতা আর কিছু হচ্ছে অপরাধ।
আসলে যারা মেধাবী খেতাব দেয় তারা নিজেরা "মেধা কি"- তা জানলে একটু ভাল হত।

মূল রচনা

আমার বড় মামার নাম হাবিবউল্লাহ।উনি ৪৯ বছর বয়সে মারা গেছেন।
কেন?মানুষ মারা যাওয়ার কারন একটাই হয়।তার মারা যাওয়ার কারন ক্যান্সার।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনা;একটা-মাত্র কারনে মানুষ মারা যেতে পারে,মৃত্যু এত সহজ না।হয়তো একটা কারন;মূল কারন হতে পারে।

মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে মামা দেশে এসেছে চিকিৎসার জন্য।বিদেশে এত টাকা খরচ করে চিকিৎসা করা তার সাধ্যের বাইরে।
আমার কেন জানি মনে হয় এটা আসল কারন না,মনে হয় সে টাকাটা নিজের জন্য খরচ করতে পারেনি অথবা খরচ করতে চায়নি।

দেশে মামা যেদিন এসেছে সেদিনই স্থানীয় এক ডাক্তার দেখিয়েছে।ডাক্তার বলেছে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে,নারায়ণগঞ্জ-এ এই চিকিৎসা সম্ভব না।

তার অসুস্থতার জন্য কয়েকজন মানুষের জীবন দেয়া বাকী ছিল।আমার তখন অষ্টম সেমিস্টার ফাইনাল পরিক্ষা চলছে।তারপরও কিছু একটা করার চেষ্টা  করছি,ঢাকায় যেহেতু থাকি।
একজন মাত্র ডাক্তার দেখাতে পিজিতে সময় ব্যয় করেছি প্রায় চৌদ্দ ঘন্টা,আর টেষ্ট করতে সময় লেগেছে সপ্তাহ।রিপোর্ট পেয়েছি ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে।হাসপাতাল কি জিনিস সেদিন আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছি।

মানুষ অপরাধ করলে পুলিশ ধরে নিয়ে হাজতে ভরে রাখে -শাস্তি হিসেবে।তাদের যদি সপ্তাহখানেক হাসপাতালের লাইনে দাড় করিয়ে রাখা যেত,তবে আমার মনে হয় অপরাধ প্রবণতা কমে যেত।

দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে একটা সিটের আশায়।প্রত্যেকদিন মামা ফজরের আজানের সময় সবার আগে ঘুম থেকে উঠে কাপড় পরে বসে থাকতো,কেউ না কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে- এই আশায়।
বেচে থাকার কি এক অদম্য ইচ্ছা,কিন্তু সে তো আগে থেকেই জানতো দিন শুরু হয়েছে ফজরের আযান দিয়ে,দিন শেষ হবে মাগরিবের আযান দিয়ে,এর ব্যত্যয় ঘটবেনা।কাউকে মামা সেকথা বলেনি বেচে থাকতে।

মামা অসুস্থ শরির নিয়ে আমাদের পাশে ঘাড় বাকা করে দাঁড়িয়ে থাকতো,কারন তার গলায় ছিল অসহ্য-জন্ত্রনাদায়ক ব্যথা।দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার ছিলনা তাই কথনো কখনো ক্লান্ত হয়ে বসে পড়তো নোংরা ফ্লোরে। আমি দুইদিন দাঁড়িয়ে ছিলাম সকাল সাতটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত।খাবার খাওয়া তো দূরে থাক,নড়তে পর্যন্ত পারিনি,কেউ সিরিয়াল ভেঙে সামনে চলে আসে-এই ভয়ে।
একদিন আর না পেরে বন্ধু জাকিরকে লাইনে দাড় করিয়ে দিলাম।
       এত কস্টের দাঁড়িয়ে থাকার পর কর্তৃপক্ষ  লিখে দিয়েছে "দুঃখিত,সিট খালি নাই।" আবার শুরু হল লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।দিন সপ্তাহ সব পার হয়ে যায়, ফলাফল একই থাকে"দুঃখিত,সিট খালি নাই।"
পরিক্ষার চিন্তায় আমার অবস্থা এত খারাপ ছিল যে বলার মত না।তাহলে একবার ভেবে দেখুন মামার পরিবারের অবস্থা কি?
একজন ঢাকা মেডিকেল,একজন পিজি,আর একজন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
এই আশায়,কোথাও না কোথাও তো সিট পাবই।
কিন্তু সিট নাই।
অনেক কষ্টেসৃষ্টে লোকজন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা গেল।কিন্তু চিকিৎসা? সেটা ছিল স্বপ্ন।দীর্ঘ একমাস সেবা পেয়েছি;একজন ডাক্তারের  শুধু দেখে যাওয়া,আর একজন নার্সের অকথ্য গালি-এটাই ছিল চিকিৎসা।
চিকিৎসা আরেকটা পেয়েছিলাম,পিজি হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে,তবে সেটা প্রাইভেট ক্লিনিকে।উনি কেন এই একই চিকিৎসা পিজিতে দিলেন'না- তা আমি জানিনা।

একসময় মামার গলা ফেটে গেল,ভয়াবহ সেই অবস্থা।আমি কাটা মুরগীকে এভাবে লাফাতে দেখেছি,এভাবে কাতরাতে দেখেছি এক্সিডেন্ট করে অংগ বিচ্ছিন্ন হওয়া মানুষকে।
তার পরও মামার সেবা ছিল শুধুমাত্র ড্রেসিং,আসল চিকিৎসার ধারে কাছেও গেল না কেউ।
পিজির ডাক্তার প্রাইভেট ক্লিনিকে বলেছিল অপারেশন করে ম্যালিগন্যান্ট সেল ফেলে দিয়ে কেমোথেরাপি দিতে হবে। কিন্তু কোথায় কেমোথেরাপি কোথায় অপারেশন।

একসময় সবাই বুঝে গেলাম মামার সময় শেষ,ওয়ার্ড বয়ও তাই বলে গেল।এত অভিজ্ঞ ডাক্তাররা কিন্তু বুঝতে পারলনা।তবে আমার মনে হয় বুঝতে না পারার কারন তাদের অজ্ঞতা না,আসল কারন নিয়মিত রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ না করা।

এত সুন্দর সেবা পেয়ে মামা মনে হয় খুব খুশি হয়েছিল,তাই একদিন ফজরের আযানের সময় আল্লাহতালার কাছে চলে গেল,আর ফিরে এলো'না।তার শরিরে এখন একফোঁটা ব্যথা নেই,সবার পরিশ্রমও শেষ।
ফজরের সময়েই তার দিন শেষ হয়ে গেল।

সারাজীবন যে লোক বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করেছে,দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, সেই দেশের সোনার ছেলেরা তাকে এর থেকে ভাল আর কি রিটার্ন দিতে পারে!যথেষ্ট পেয়েছে সে!

দেশের মেধা এখন প্রাইভেট ক্লিনিকে আটকে আছে,তার নিজেরই এখন ক্যান্সারের চিকিৎসা দরকার।

মেধা তুমি কবে সেবায় রুপ নেবে?নীতি বাক্যের পাহাড় বানিয়ে তুমি কি বন্যার বাধ আটকাবে,নাকি বন্যার্তকে সাহায্য করবে?তুমি কি কোনদিন ঐ ভাল রেজাল্ট নামের ফুলঝুরিতে আটকে পরা থেকে বের হবেনা?কবে দেখবো তোমার মত সোনার ছেলে?আর কবে বন্ধ হবে তোমার মুখের ঐ বড় বড় কথা?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস