কবিরাজ




স্যার পড়াচ্ছেন, "বিপরীত শব্দ" খারাপের বিপরীত ভালো, দিনের বিপরীত রাত, চন্দ্রের বিপরীত সূর্য, গ্রহের বিপরীত উপগ্রহ।"

আমি বললাম,"স্যার, পৃথিবী একটা গ্রহ, আর চাঁদ তার উপগ্রহ। গ্রহের বিপরীত যদি উপগ্রহ হয়, তবে চাঁদের বিপরীত হওয়া উচিৎ ছিল পৃথিবী, কিন্তু হয়নি। চাঁদের বিপরীত হয়েছে সূর্য। কেন?"

স্যারের উত্তর পাই'নি, উল্টো বকা খেয়েছি। কেন?
আমি জানিনা ।মনে হয় কেউই জানে না।

সেদিন থেকে মনে হয় স্যার একজন প্রফেশনাল কবিরাজ। শুধু প্রাইভেট প্রেসক্রিপশন দিতে জানে। ভুল ধরাও যাবেনা, করাও যাবেনা। তাহলে  সাইড-এফেক্ট শুরু হয়ে যাবে। তার থেকে বরং আরেক কবিরাজের কাছে যাই চলুন।

২০১৫ সালের শীতকালের ছোট্ট একটা ঘটনা বলছি;

আমার পাশের বাড়ীর দাদী খুব অসুস্থ, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে, সবাই বুঝতে পারছি অবস্থা বেগতিক, কিন্তু তার পরিবারের কেউই দাদীকে হাসপাতালে নিতে চাচ্ছেন না।

তাদের টাকা আছে কিন্তু খরচ করবে না-এই জন্য না।
কারন একজন কবিরাজকে খবর দেয়া হয়েছে, তিনি আসছেন।

বলে রাখি, এই পরিবার কবিরাজ অনুরক্ত পরিবার, ঘরের চাবি হারিয়ে গেলেও তারা কবিরাজের কাছে যায়,চাবি খুঁজে পেলেও কবিরাজের কাছে যায়।

বাড়িতে পা রাখা মাত্রই কবিরাজ-(তিনি একজন মহিলা) -বলে বসলেন," রোগীকে বান মারা হয়েছে।"

আমাদের এলাকায় মন্ত্রের মাধ্যমে বশ করাকে কবিরাজি ভাষায় বান বলে। অবশ্য এই বান মারা বিষয়টার অস্তিত্ব আছে বলে আমার মনে হয়না, আর থাকলেও কেউ বান মারতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। প্রাচীন মিশরীয় জাদুবিদ্যা বা আফ্রিকান কালো জাদু এতোটা সহজ বিষয় না -যে আজকের কবিরাজ নামক জোচ্চোরের কাছে তা পান্তাভাত হয়ে যাবে।

যাহোক তিনি কথিত "চিকিৎসা" শুরু করার আগে আবার বললেন," হাসপাতালে যেতে হবে না, ডাক্তার কী করবে? এখনি বান ছুটিয়ে দিচ্ছি।"
বলে রোগীকে জোর করে হাটালেন।উঠান খুঁড়ে বের করলেন শামুকের ভাংগা খোলস।খোলস হাতে নিয়ে বললেন," এইটাই নাটের গুরু।"
তারপর বাজখাঁই গলায় বললেন," কে, কে মেরেছে বান, এখনি কেটে দেবো তার কান।"
বলে আমাদের সবার দিকে সবজান্তা মার্কা রাগী মুখ করে তাকালেন।"

সত্যি বলছি, শিক্ষিত হওয়া সত্যেও আমি তখন অস্বস্তি বোধ করছিলাম। কারন এখন যদি কবিরাজ বলে আমি এই কাজ করেছি,তাহলে অনেকেই বিশ্বাস করবে কথাটা। শামুক যে কবিরাজের উঠানেও পাওয়া যেতে পারে- এই কথা আমি উপস্থিত কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবো না।

কবিরাজ তাবিজের বন্যা বইয়ে দিলেন। আমার পঁয়তাল্লিশ কেজি ওজনের দাদী তাবিজের ভারে এমুহূর্তে ষাট কেজি হয়ে গেলো।
দুঃখে বাড়ী থেকে বের হয়ে এলাম। কারন দাদী কিছুক্ষণ পরেই ব্রেন স্ট্রোক করেছিল।

বেশকিছু দিন পর আমাদের অনেক চেষ্টা তদবিরের পর হাসপাতালে রোগীকে একটা চেকাপ করানো গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কবিরাজ পরে বহুবার এসেছে। যতোবার এসেছে ততবারই বলেছে তিনদিনের মধ্যে রোগী উঠে দাঁড়াবে।
 বলা বাহুল্য দাদী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর বিছানা ছেড়ে ওঠেনি, কোমায় দেড় বছর থাকার পর মারা গেছে।

আমি কবিরাজকে খোঁচা দিয়ে সবার সামনে জিজ্ঞেস করেছিলাম," কী গো  ডাক্তার নানী, রোগী তিনদিনে দাঁড়াবে, এখনতো দেখছি একবারে শুয়ে পড়লো।"

তিনি যা বললেন তাতে আমার মনে হলো পড়াশোনা না করলেই বোধহয় ভালো করতাম।
দাদীর মেয়ে; মানে আমার ফুপুর দৃঢ় বিশ্বাস, ডাক্তার না দেখালে তার মা আজও বেচে থাকতো! ডাক্তার নিজেই নাকি তার মাকে "নজর" করেছে!

কবিরাজ আমার কথায় বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে বললো," সুস্থ করে ফেলেছিলাম, ডাক্তারের কাছে না নিলে দেখে দিতাম রোগী মরে কি করে!"


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস