ভাঙা জানালা

                     মোঃসিফাত হোসেন

এই পৃথিবীতে মাত্র দুটো জিনিস দশ দিক আলোকিত করতে পারে;এক সূর্য, দুই জ্ঞান।

সেই জ্ঞান কারো জীবনকে করে দেয় সরল,কারো বক্র আবার কারো ফুলস্টপ।

প্রথম খন্ড:
    দীর্ঘ একটা বাক্ যুদ্ধের পর স্যার বললেন কুমিল্লা যাব।আমরা বললাম কুমিল্লা তো গত বছর গিয়েছিলাম, এবার না'হয় অন্য কোথাও নিয়ে যান?
স্যার রাজি হলেন না।
   আমাদের স্যারেরা কোন কিছুতেই সহজে রাজি হয় না।
আমার শিক্ষক হওয়ার প্রবল ইচ্ছা,শুধুমাত্র; তারা কেন সব কিছু সহজভাবে বুঝতে চায় না;এই রহস্যটা জানার জন্য।
একটা বনভোজন আয়োজন করতেই যে অবস্থা,না জানি কুমিল্লা যেতে অবস্থা কি হয়।

    ঠিক এই কারনে আমরা মাঝে মাঝে যুদ্ধ ঘোষনা করতাম।সামান্য একটা ফিল্টার নিয়েও আমাদের আন্দোলন করতে হয়েছিল।
ঢাকার পানির অবস্থা খুব খারাপ,এটা মোটামুটি সবাই জানে,জানেনা শুধু আমার স্যারেরা।
    একবার কলেজে পানি পান করে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত গিয়েছিল।এরকম মাঝেমধ্যে হয়,তারপরেও হয়'না সমাধান।

   আমাদের কোন বিকল্প ছিল না,সামান্য একটা অধিকারও প্রানের দাবী হয়ে গেল।তাই ছাত্ররা বাধ্য হয়ে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন শুরু করল।চার দিন আন্দোলন করার পর দাবি মেনে নেয়া হল,একমাস পর বসান হল ফিল্টার।
এমন একটা জায়গায় বসান হল যে,আমরা ফিল্টারিং করা পানি পান না করে,দূষিত পানি পান করে অসুস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।কারন ফিল্টার বসান হয়েছিল বাথরুমের দরজার সামনে।কলেজের বাথরুম কেমন হয় তা আর না বললাম।

    অনেক আবোলতাবোল বকেছি এবার পূর্ব কথাতে ফিরে আসি।

   স্যার সবজান্তা মার্কা হাসি দিয়ে প্রশ্ন করলেন," তোমরা কিছুদিন পরপর বাড়ি যাও কেন?"
একজন বলল বাবা মাকে দেখতে।
স্যার আবার বলল,
"একবার তো বাবা মাকে দেখেছ, তাহলে বারবার দেখার কি দরকার?"
    ছাত্রটি এই প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল,এরকম প্রশ্নের উত্তর হয় না তার পরেও  আমতা আমতা করে বলল," তাদের আমরা ভালবাসি, বারবার দেখলেও বিরক্ত হই না,তাই দেখতে যাই।"
স্যারঃ,"তাহলে কুমিল্লা বারবার গেলে সমস্যা কি?"হাসি মুখে স্যারের জবাব।

    সেদিন স্যারের যুক্তির আক্কেল দেখে আমার অজ্ঞান হওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল কারন স্যার যুক্তিবিদ্যা পড়াতেন।কু-যুক্তিটাকে কি সুন্দর করে চালিয়ে দিলেন।
এমন প্রিজারভেটিব মাখান যুক্তি আমি আমার গোটা জীবনে আর কখনো শুনিনি।কোন অশিক্ষিত ব্যক্তির মুখেও না।
    ইঁদুর যুক্তি বুঝে কিনা আমার জানা নেই,যদি বুঝে থাকে তাহলে ভাল কাটতো।প্রিজারভেটিব মাখানো খাবার ওদের খুব পছন্দের  কিনা!

   সেদিন স্যারকে কোন প্রশ্ন করিনি।
আমাদের দেশে বড়দের যৌক্তিক প্রশ্ন করাকে অনেকে আবার তর্ক বলে।

দ্বিতীয় খন্ড

    পাটনী শব্দের অর্থ আমি জানি না।আমাদের এখানে পাটনী বলতে বুঝায় খেয়াঘাটের মাঝি,হয়ত এর অর্থ তাই।
দুই গ্রামের মাঝে ছোট নদী,বর্ষাকালে বড় হয়ে যায়।সেই নদীতে;ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের পাটনী মহাশয় মানুষ পারাপার করে,কোন টাকা নেয় না।তবে কেউ খুশি মনে দিলে সেও খুশি মনে গ্রহন করে। আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অবশ্য খুশি হয় না।যারা ভুল করে খুশি হয়,তাদের চক্ষুলজ্জা কিছু থাকলেও থাকতে পারে।

    পাটনী ছিল বৃদ্ধ,তার বৈঠা বাওয়ার মত জোর ছিল'না,তাই তার ছেলে এখন বাবার কাজ করছে।
ধানের মৌসুমে ছোট পাটনী বছরে একবার সবার বাড়িতে ধান সংগ্রহ করে,তার বাবা;মানে বড় পাটনীও তাই করত।
তাদেরও তো খেতে পড়তে হয়,তা না হলে চলে কি করে।
তবে তাদের কোন চাওয়া ছিল না,যার যা খুশি দিত,তারাও খুশি মনে গ্রহন করত,না দিলেও কোন কথা ছিল না।
কিন্তু এখানেও মনে হয় বেশির ভাগ রামগরুড়ের ছানা,খুশি হওয়া মানা।কেউ বলে আমি তোমার নৌকায় এবছর পাড় হইনি,কেউ বলে পরে এস,কেউ বলে এত জ্বালাতন!

    নৌকা একবার ফুটো হয়ে গিয়েছিল,সাহায্য তো করেইনি অনেকে প্রশ্ন করেছে এখানে নৌকার কি দরকার।অবশ্য তখন শীতকাল ছিল,নদীতে পানিও ছিল না।
    কেউ তা সারানোর পয়সা পর্যন্ত দিল না।সদয় ব্যক্তি যে ছিল না এমন নয়, যারা ছিল তাড়াও দরিদ্র,তাদের সাহায্যে কোনমতে ফুটো বন্ধ করা গিয়েছিল সেবার।
সেই পাটনীর ছেলে পাটনীর নৌকাতে পাড় হচ্ছিলাম,আমার সাথে কিছু ছাত্র সাইকেল নিয়ে নদী পাড় হচ্ছিল।
     পাটনীকে ডেকে বললাম,"
   মাগনা পাড় করে তোমার লাভ কি?"
সে বলল লাভ ক্ষতির হিসাব শিক্ষিতদের,আমাগো কোন লাভ লোকসান নাই।"
     "আচ্ছা,অন্য কাজও তো করতে পার।"
সে বলল,"ছোট বেলায় জোর করে দুই একবার স্কুলে গেছিলাম,স্কুল পলানের সময় ভাঙা জানালা দিয়া স্যারের একটা কথা শুনছিলাম "মানুষের উপকারে পূন্য হয়"-আর অন্য কাজের কথা কও,সব কাজ কাজই কাজ, তাতে কোন ফাড়াক নাই,তাছাড়া আমরা অশিক্ষিতরা সব কাজ করলে তোমরা বড় বাবুরা কাজ খুজে পাবা কই?তখন সব কাজ নিজেরেই করতে হবে,এখন তো ছোট কাজ করতে তোমরা বাবুরা লজ্জা পাও, তখন কি করবা?নিজের জুতা নিজেরেই সেলাইতে হবে।"

     কথার মধ্যে যুক্তি আছে,নিয়ম না মানা একটা সরল আর সুন্দর যুক্তি কিন্তু ও সেটা জানে না,নিয়ম মেনে সব কিছু হয়ও না।আমার স্যার তো নিয়ম মেনে শিক্ষিত হয়েছে,তার বেলায় তো এরকম হয়নি।আসলে শিক্ষাটাই বড়,কার কাছে শিখলাম সেটা বড় বিষয় না আর তাছাড়া দু'পাতা পড়াশুনা করলেই তো আর তাকে শিক্ষিত বলা যায়'না।
 
     দুই একদিন জোরকরে স্কুলে যাওয়া ছেলেটা জ্ঞান কি বুঝতে পেরেছে,জানালা ভেঙে বেড়িয়ে যাওয়া একটা জ্ঞান সে ধরে রেখেছে।আর আমার ঐ জ্ঞান দান করা স্যার ধরে রেখেছে তার শূন্য ঝুলিতে ইঁদুর ধরার জন্য হুলো বেড়াল।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস