সন্তানহারা

                    মোঃসিফাত হোসেন

    সমুদ্রের নিচ দিয়ে এক প্রকার স্রোত বয়ে যায়,এই স্রোতকে বলে চোরা স্রোত,এর কোন শব্দ নেই,নিরবে বয়ে যায়।এই
স্রোত সম্পর্কে অনেকেই জানে'না।তাতে কি হয়েছে,চোরা স্রোত'তো আছে,নাকি!

প্রথম খন্ড:

    হজরত মিয়ার বউ আমাদের গ্রামের বাসিন্দা,তার কোন ছেল-মেয়ে নেই,সম্প্রতি তার স্বামীও মারা গেছে।
ছোট্ট একখণ্ড জমি আছে থাকার জন্য,বর্ষাকালে যে কোন মুহুর্তে ভেসে যেতে পারে।ছোট্ট ভিটেয় একটা ঘর আছে,তাতে ফুটোর অভাব নেই,ফুটো সারানোর পয়সাও তার নেই।বেচে থাকার জন্য খেতে হয়;তাই শাক -পাতা খেয়ে বেচে আছে।
অবশ্য এটাকে জীবন বললে তবেই বেচে থাকা বলে।
সে কিভাবে চলে এটা আমার কাছে একটা বিস্ময়,আমি হাজার চেষ্টা করেও ওভাবে বেচে থাকতে পারবো'না।

সব সমাজেই কিছু মানুষ থাকে যাদের সম্পদ বলতে নিজের দুই হাত, হজরত মিয়ার  বউএর তার থেকে একটু বেশি ছিল;দুটো ছাগল।হাড়ি-পাতিল যা আছে তাকে হাড়ি-পাতিল বললে হাড়ি-পাতিলও লজ্জায় মুখ লুকাবে,প্রদীপ আছে একটা ঘরে,হজরত মিয়া বেচে থাকলে হয়তো জ্বলতো,তেলের অভাবে এখন আর জ্বলে'না।আধুনিক যুগেও তার ঘরে ঘড়ি নেই,মসজিদের আযানই তার ঘড়ি।এজন্য সে কারো কাছে হাত পাতে'না,কেউ তাকে সাহায্যও করে'না।সমাজের মানুষ তাকে একপ্রকার ভুলে গেছে।

দারিদ্র আর ভদ্রতা এই দুটো জিনিশ সব সমাজেই দুর্বলতার প্রতিক।সমাজপতিদের এই গুন থাকতে নেই।
সমাজে বা পত্রিকায় তারাই আলোচনাতে আসে যারা সু-কির্তি বা কু-কির্তি করে,আলোচনাতে আসতে পারাটাই তাদের কাছে সব কিছু,তা সে যাই হোক।
সমাজ যাকে নিয়ে কথা বলতে ভুলে গেছে সে আবার মানুষ!

 হজরত মিয়ার বউ এরকম একজন মানুষ,সমাজ যাকে ভুলে গেছে,সে কোন আলোচনাতেও নেই।

   একবার কোরবানির গোশত দিতেও সমাজ নামধারীরা ভুলে গিয়েছিল,সবাই গোশত পেয়েছে,পায়নি হজরত মিয়ার বউ,এতে কেউ অবশ্য লজ্জিত হয়'নি।গরিব মানুষ না খেয়ে থাকলে ক্ষতি নেই!ওদের অভ্যাস আছে!তার থেকেও বড় কথা কেউ নালিশ করতে আসবে'না।

গোশতের জন্য হজরত মিয়ার বউএর কোন আফসোস নেই।তার আফসোস একটাই,যদি তার একটা সন্তান থাকত! অসুস্থ মাকে খাবার দিতে না পারুক,এক গ্লাস পানি তুলে তো দিতে পারত!দৌড়ে এসে বলতে তো পারতো, "মা,আমি আছি তোমার পাশে,তোমার কোন কষ্ট নেই।"

হজরত মিয়া বেচে থাকতে কত কষ্টই না করেছে,তবু কারো কাছে হাত পাতে'নি,মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে পশুর মত খেটেছে,আর প্রতি রাতে নিরবে কেঁদেছে ;যদি তাদের ভাংগা ঘরে একটা প্রদীপ জ্বলত, একটা সন্তান যদি থাকতো!

রাতে এখন একা ঘুমায় হজরত মিয়ার বউ,বড়বড় নিশ্বাস বেড় হয় তার বুক চিড়ে।কিছুদিন পর তার ঘরও কবর হয়ে যাবে,কেউ তাতে আলো জ্বালবে না।

মৃত্যুর পর মানুষের কোন আশা থাকতে নেই।আশা করতে হয় বেচে থাকতে।সেই আশায় তার বড় নিশ্বাসের সাথে অশ্রবণীয় একটা শব্দ বেড় হয়ে আসে,আমি স্বামীহারা,নি:সন্তান।

দ্বিতীয় খন্ড
   সাহেরা বেগম সখ করে ছেলের নাম রেখেছিল মানিক।মানিকের বাবা মারা গেছে বেশ কয়েক বছর হলো।ছেলে প্রতিষ্ঠিত,সরকারী চাকরী করে,সংসারে কোন অভাব নেই,গ্রামের আর দশজনের চাইতে স্বচ্ছল।

মা সাহেরা বেগম তাই চেয়েছিল,ছেলে বড় হবে,মানুষের মত মানুষ হবে।কিন্তু ছেলে যে এত বড় মানুষ হবে মা আশা করে নাই,হিরে কাটা মানিক এত আলো ছড়াবে তা কে আশা করেছিল!ছেলে মানুষ হয়েছে,তবে কার মত,মা জানে'না।

ছেলে  মাকে মাঝেমধ্যে মন চাইলে খাবার দেয়,কাপড় দেয় এক রোজার ঈদে।ঘরময় ইদুর-বেড়ালের উপদ্রব, মাঝেসাঝে শিয়ালও উকি মেরে যায়।ভাংগা বেড়া ঠিক করার কেউ নেই,শিয়াল তো আসবেই।আরো বড় কিছু আসলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
চোরও এরকম ঘরে আসলে লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা খুজে পাবে'না,বৃথা পরিশ্রম হবে,চোর কিছুই পাবে'না,তা সে আগে থেকেই জানে।

ছোট বেলায়তো না খেয়ে মায়েরা ছেলেদের খাওয়ায়,এখন না খেয়ে থাকলে তাতে কিছু দোষের নয়,আর বৃদ্ধ বয়সে শরিরের যা অবস্থা হয়,তাতে কম খাওয়াই ভাল! আর ঘড়,ঘর দিয়ে কি করবে তারা,ক'দিন পরেতো মরেই যাবে!

  বাবার ছিল উচ্চ রক্তচাপ,মা একসময় ছেলেকে বলেছিল তোর বাবার প্রেসারটা কয়েকদিন যাবত বেড়েছে।ছেলে বলেছিল আমার কাছে টাকা নাই,টক কিছু খাওয়াও ঠিক হয়ে যাবে।ছেলের বউ বলেছিল, ছেলের প্রতি আপনার দেখছি কোন মায়া নাই,মাত্র কাজ থেকে ফিরে এসে শুয়েছে আর শুরু করেছেন ঘ্যানঘ্যানানি, বলি পরে বললে কি হ'ত না!
মা অশ্রু সজল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়েছিল,ছেলে মহা ব্যস্ত,মোবাইলে গেমস খেলছে!শিক্ষিত ছেলে;এর থেকে জরুরী কাজ আছে নাকি দুনিয়াতে!

ছেলেকে রাতে ছাড়া পাওয়া যায়'না,এমন কথা মা বলতে পারেনি,পারেনি নিজের অসুখের কথা বলতে।ছেলের শ্বাশুরি বলেছে আরো কড়া কথা।
কারো কথাতেই মার কিছু আসে যায় না,তার পেটের ছেলেই তো যা বলার বলে দিয়েছে।

মায়ের চোখের গরম জ্বল ঠান্ডা হয়,শুকিয়ে যায়,শুকায়'না কলিজার ক্ষত।ছেলে যে মায়ের কাছে আসে'না,মায়ের ভাল-মন্দ খোজ নেয়'না।এসব খাবার,কাপড়ের কী মূল্য!বাবা বেচে থাকতে কামলা দিত,সত্তুর বছর বয়সে কে তাকে কামলা নেবে।

পেটের দায়ে মানুষ কত কিছু করে আর তো বয়স!মা ভাবে,ভাবনা ছাড়া কিইবা করতে পারে বৃদ্ধ মানুষটি।
বাবা এখন আর নেই,মরে গেছে,হয়ত এখন তার প্রেসারটাও নেই।

ছেলে ছেলের বউ বাচ্চা নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থাকে,শ্বশুর বাড়ি ঘরের কাছেই।পাকা বাড়ি থাকতে কেন ছেলে ভাংগা ঘরে থাকবে?

মাঝেমধ্যে ছেলে মাকে দেখতে আসে, বউ এটা পছন্দ করে না।বলি,তুইও তো মা,সন্তান দূরে চলে গেলে তোর খারাপ লাগে,আমার লাগে'না?

এসব বৃথা আহাজারি,কেউ শুনতে পায়'না।মা তো কারো কাছে বলে না,এগুলো তার বুকের ভিতরে অন্ধকার কূপে আটকা পড়ে গেছে।সেই শব্দ কেউ শুনতে পায়'না।শুধু মায়ের ভেজা চোখের নিরব অশ্রু বলে যায়,আমি স্বামীহারা, সন্তান থাকতেও সন্তানহারা।

সরকারী চাকরী করা ছেলের কাছে ঔষধ কেনার টাকা নাই,এর চাইতে ধ্রুব সত্য আর কিইবা হতে পারে।
লাগবে'না তোর ঔষধ,ছোট বেলায় কত না খেয়ে তোকে খাইয়েছি,জন্মের সময় নিজে কম টাকার ঔষধ খেয়ে  তোকে কত ভাল খাবার কিনে দিয়েছি,আর আজ পারবো না?অবশ্যই পারবো!
অসহায় মায়ের স্বপ্নটাই তো বড় ঔষধ।

   সমাজ বহুদূর চলে গেছে কিন্তু তার পুরনো  মানুষ নিয়ে যেতে পারেনি।প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু যে চিত্র,সে চিত্রই রয়ে গেছে।
এক মা খেতে পায়'না,আর এক মা খেতে পারে'না।এটাই তো সমাজ।বিবেককে প্রশ্ন করে কোন লাভ নেই,সে তো এখন আধুনিক সমাজে বাস করে।
আধুনিক ঘরে পুরনো আসবাবপত্রের কোন জায়গা হয়'না,হয়নি কোন কালে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস