এ্যানটিক্স
"জন্মদিনে আমাকে কি কিনে দেবে বাবা?"
জাহিদের ছেলে মিরাজ এভাবেই প্রশ্ন করলো।জাহিদ হাসি মুখে উত্তর দিলো,"এখন বলা যাবে না,কালকে হবে সব।"
মিরাজ এতোটুকুতেই খুশি,ও জানে বাবা মিথ্যে বলে না।
বুকের খুব গভীর থেকে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে জাহিদের।মা মরা ছেলেটার বয়স পাচ,তার মধ্যে সাইকেল চালাতে গিয়ে পায়ের গোড়ালি কেটে ফেলেছে।কোন ভাবেই সারছে না।অনেক কষ্টে ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে।কষ্ট হচ্ছে কারন জাহিদ বেকার,দুই একটা কোন রকম টিউশানি আছে।তাই দিয়ে চলতে হয়।গ্রামের বাড়ি,টিউশানির টাকা এমনিতেই কম তার মধ্যে অনেকে টাকা দেয়ার সময় টালবাহানা করে।
গ্রামে খরচ যেমন কম ইনকামও তেমনি কম।
জাহিদের চাচা,ভাই,মামা সবাই আছে,শুধু সম্পর্কের দিক থেকে,সাহায্য'র দিক থেকে ওর কেউ নেই।মা-বাবা বেচে থাকলে কষ্টটা অন্তত ভাগ করতে পারতো জাহিদ।
পরদিন।
জাহিদ জেলা সদরে ঘুরছে,অসুস্থ ছেলেটাকে কি কিনে দেবে, কাছে টাকা যা আছে তাতে ও বড়জোর একটা পুতুল কিনতে পারবে,কেক কেনাই যাবে না,মিথ্যে বলতে হবে।
জাহিদ অনেক কষ্টে একটা এ্যানটিক্স এর দোকানের দিকে পা বাড়ালো।এ্যানটিক্সের দোকানে পুরোন সব জিনিস পাওয়া যায়।একটু ঝেড়ে মুছে বা রঙের প্রলেপ লাগিয়ে নতুন চেহারা দিয়ে পন্য গুলো বিক্রি করা হয়,মূল্যেও কম।কিন্তু সাধ্য থাকলে কি আর এখানে আসে কেউ!এজন্যই কষ্ট হচ্ছে জাহিদের।
খেলনাগুলো দেখছে জাহিদ,কোনটা কেনা যায়।হঠাৎ ওর দৃষ্টি একটা ব্রোঞ্জ এর মূর্তির দিকে আটকে গেল,অনেক পুরোন জিনিশ।একজন মা তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করছে,কি সুন্দর মুহূর্ত।মায়ের মুখে যেমন স্নেহের হাসি,শিশুর মুখেও তেমনি ভরা পূর্ণিমার হাসি।
মুর্তিটা হাতে নিয়ে জাহিদের দম আটকে গেল।এই খেলনাটা জাহিদের, জাহিদের বাবা জাহিদকে উপহার দিয়েছিল এটা।চুলের মত সরু ফাটলটা এখনও আছে,ওইতো দেখা যাচ্ছে,রঙের কারনে বোঝা যায় না,তবে আছে।অনেক দিন আগে মূর্তিটা জাহিদ হারিয়ে ফেলেছিল।কাকতালীয় ভাবে আবার পেয়েছে।এরকম হয়,খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা,তবে জাহিদ খুব অবাক হয়েছে,খুশিও হয়েছে।
পুরোন দিনের কথা মনে পরেগেছে জাহিদের।ওর বাবাকে কেউ একজন বিদেশ থেকে মূর্তিটা উপহার দিয়েছিল।জাহিদকে ওর বাবা জন্মদিনে এটা দিয়েছিল খেলতে।কিছুদিনের মধ্যেই মূর্তিটা ভেঙে ফেলেছিল জাহিদ।
ছোট বেলায় জাহিদের মা মারা যাওয়ার পর ওই মূর্তিটাকে জাহিদ মা বলে ডাকতো।জাহিদের বাবা বুঝতে পারতেন না; জাহিদ আসলে মূর্তিটাকে মা বলছে,না-কি কোলের বাচ্চাটার মা বলে সম্মোধন করছে।
বাবা কিছুই বলেনি সেদিন,স্কুল মাষ্টার বাবা সারাদিন খাটনি করে এসে অর্ধেক রাত পর্যন্ত খেটে মুর্তিটি জোড়া লাগিয়ে দিয়েছিল।ঠিক করার পর বাবা হাসিমুখে বলেছিল,"নে তোর মা ঠিক হয়ে গেছে।"
জাহিদ সেদিন বোঝেনি বাবা আসলে কি বলেছিল।
আজ মূর্তিটা হাতে পেয়ে সেদিনের সেই চশমা পরা মাষ্টার বাবার ছোয়া পাচ্ছে জাহিদ।
মূর্তি হাতে পেয়ে মিরাজ প্রচণ্ড খুশি হয়েছে,তবে একটা ব্যাপার ছেলেটা ধরে ফেলেছে;মূর্তিটাতে একটা সূক্ষ্ম ফাটল আছে, এটা ও খেয়াল করেছে।বাচ্চারা খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন হয়।
জাহিদ কোন লুকোচুরি না করে সব ছেলেকে বলে দিল,নিজের ছোট বেলার কথা,বাবার কথা,মূর্তিটাকে জাহিদ মা বলে ডাকতো এটাও বলল।আরেকটা কথা হাসিমুখে বলল,"ওই ফাটলটা আমার বাবার ভালবাসা দিয়ে ঝালাই করা।"
সব শোনার পর মিরাজ মূর্তিটা ইচ্ছে করে ছুড়ে ফেলে দিল।
"ফেলে দিলি কেন,পছন্দ হয়নি?"জাহিদ দ্রুত জিজ্ঞেস করলো।মূর্তিটা হাতে নিয়ে জাহিদ পরিক্ষা করে দেখলো,কনক্রিটে লেগে গায়ের ফাটলটা এখন একটু বড় হয়েছে খালি চোখেই দেখা যায় এখন।
মিরাজ বলল," তুমি মাকে ভালবেসে ঠিক করে দাও বাবা।"
বাচ্চারা মাঝেমধ্যে এমন প্রশ্ন করে যার কোন উত্তর হয়না,আবার এমন উত্তর দেয় যার প্রশ্ন কেউ কোনদিন শোনেনি।
জাহিদ একহাতে মূর্তি আরেক হাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছে।ওর চোখ ভেজা,শিশিরধৌত পবিত্র বাবার সেই চোখ,পৃথিবীর প্রতিটা বাবার স্নেহ সেই চোখে...............।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন