ব্রিজ
শুরুর আগেঃ
যার পিছনে বলার মতো কোন গল্প নাই,সে আসলে বড় হয় নাই।
যে বড় হয়েছে অথচ তার পিছনে কোন গল্প নাই,হয় কেউ তাকে বড় করে দিয়েছে নয়তো সে মিথ্যার মুখোশ পরে আছে।
ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে,ছেলেরা সাইকেল চালিয়ে,মেয়েরা হেটে।কাচা রাস্তায় এখনো যান চলাচল শুরু হয়নি,তাই সাইকেলই একমাত্র ভরসা।
স্কুলে যাওয়ার পথে খুব উচু একটা ব্রিজ পার হতে হয় ছাত্রদের।বর্ষায় রাস্তা ভেঙে প্রাকৃতিক ভাবেই উচু হয়ে গেছে ব্রিজটা।ব্রিজ পার হতে ছাত্রদের কাল ঘাম ছুটে যায়,কারন ওরা ছোট।তবু ওরা পার হয়।
শেষের দিকে আর পারেনা একজন ছাত্র।দুই জনে এক সাইকেলে চললে কষ্টটাও দ্বিগুণ হয়,তবুও সাইকেল থেকে নেমে কষ্টেসৃষ্টে ধাক্কাধাক্কি করে ব্রিজে উঠে যায় ছেলেরা,ওরা জানে যত কষ্টই হোক না কেন ব্রিজের ওই পাড়ে আছে শান্তি,কষ্টহীন যাত্রা।
ব্রিজের রেলিঙে বসা একজন ছাত্র তখন বলে ওঠে,"এই জন্যই সাইকেল কিনি না,আমাকে দেখ;আমি হেটে আসি।একা কুস্তি করতেই ভাল লাগে না,আবার দুইজন।"
মধ্যমাঃ
নজরুল;আমার বন্ধু,আমি জানি না ও এখন কোথায় আছে,তবে জানি যেখানেই থাক নজরুলরা সব সময় ভাল থাকে।
আমি যখন স্কুলের ছাত্র,তখন ওকে সাইকেলে করে স্কুলে নিয়ে যেতাম,কারন ওর সাইকেল ছিল না।প্রায় আট কিলোমিটার রাস্তা হেটে যাওয়া শীত কিংবা গরম কোন কালেই আমার পক্ষে সম্ভব না।কিন্তু নজরুল এটা অনায়াসে পারতো।
যেদিন থেকে ওর সাথে আমার পরিচয়,সেদিন থেকেই বন্ধুত্ব,সেদিন থেকেই একসাথে সাইকেল যাত্রা।ওর সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে আমি একদিনও সাইকেল চালাইনি।নজরুল সাইকেল চালাতো,আমি পিছনে বসে থাকতাম।
আর দশটা ছেলের মত নজরুলের জীবন স্বাভাবিক ছিল না।
নজরুলের বাবা মারা গেছে ওর যখন এক বছর বয়স।সেদিন থেকেই ওর মা পাগল।
প্রবাদে একটা কথা আছে কষ্টের পরে আসে সুখ।আমি এই প্রবাদ বিশ্বাস করিনা।প্রকৃতভাবে কষ্টের পরে আরো কষ্ট,তার পর আরো কষ্ট তারপত সুখ।প্রতি তিন ধাপ কষ্টের পরে আসে সুখ।
আমি একটা জিনিশ খুব ভাল ভাবে লক্ষ্য করেছি,নজরুল নামের সাথে কোথায় যেন একটা বিদ্রোহ ভাব লুকিয়ে থাকে আর থাকে বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাস।
নজরুলের মা পাগল হওয়ার বেশ কিছুদিন পর থেকে নজরুলকে রান্না করে খেতে হয়েছে।আমি জানি ও প্রত্যেকদিন দুই বেলা খেত।কারন পড়াশুনার পাশাপাশি সংসার চালানোর মত ইনকাম এই বয়সে অসম্ভভ,আর একটা হচ্ছে,নয়টা থেকে চারটা পর্যন্ত ক্লাস শেষে রান্না করে খাওয়াও অসম্ভব।যেসব গ্রামের মেয়েরা পাতা দিয়ে রান্না করেন,তারা বুঝবেন আমি আসলে কি বলছি।
তবুও নজরুল থেমে থাকেনি।এস,এস,সি পরিক্ষার সময় নজরুলকে আমরা সব ছাত্র শিক্ষক মিলে ফর্ম ফিলাপ করে দিলাম,কিছু টাকা বেচে গিয়েছিল তাই দিয়ে কলম আর খাতা কিনে দেয়া হলো।কিন্তু বিপত্তি বাধলো অন্য জায়গায়।পরিক্ষার পড়া,ইনকাম,খাওয়া সব একসাথে ভয়াবহ রুপ নিল।আমরা কেউ ওকে সাহায্য করিনি।তখন পরিস্থিতি এখনকার মত সহজ ছিল না আর আমাদের মাথা ছিল পরিক্ষার চিন্তায় ব্যস্ত।নজরুল সেই সময় একটা বিস্ময়কর সমাধান বের করেছিল,যা আমার দ্বারা বাস্তবায়ন করা বা চিন্তা করা এখনো সম্ভব নয়।
নজরুল রাতের জন্য শ্যালো ম্যাশিনে চাকরি নিয়েছিল।সেখানে রাত জেগে ক্ষেতে পানি দিতে হতো।ফলাফল একসাথে তিন কাজ,পড়ার জন্য আলাদাভাবে রাত জেগে থাকতে হয়না,খাবার আসে ম্যাশিন মালিকের বাড়ি থেকে আর ম্যাশিন ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি ছিল যার আলোতে নজরুল পড়তে পারতো!
শেষের আগেঃ
কোন দিকে কান নেই ছেলেটির,আবার ও সাইকেলে চেপে বসে,পিছনে আরেকজন।দুজনের মুখেই মিষ্টি হাসি।পা দিয়ে হাল্কা একটা ধাক্কা দিতেই বহুদূর একাই চলে যায় সাইকেলটি।পিছনের রেলিঙে বসে থাকা ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সাইকেলটির দিকে,সাইকেলটি এখন একাই চলছে!!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন