পীর

একঃ

পাবলিক সেন্টিমেন্ট খুব খারাপ জিনিস, গণপিটুনি হচ্ছে তার ফল। কিন্তু তারপরেও মানুষ ঝুঁকি নেয়- সত্য উৎঘাটন করে।

রাজধানী ঢাকার গুলিস্তান; বাটপারির জন্য সুবিখ্যাত। এখানে সরাসরি বাটপার যেমন পাওয়া যায়, তেমনি মুখোশধারী বাটপারও পাওয়া যায়। সরাসরি বাটপারেরা মুখ লুকায় না, যা করে সামনাসামনি করে।

আমার এক চাচার কাছে একজন মুখোশধারী বাটপারের সন্ধান পেয়েছি।
যিনি নিজে পীড় সাহেব, আবার খুব বিখ্যাত এক মাজারের খাদেম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে গুলিস্তান এলাকা আমি ভালভাবে চিনি, তাই আস্তানা খুজে পেতে সমস্যা হয়নি। আস্তানার নাম বাবা সাহেবের দরগাহ। (আসল নাম না)।

খুজে তো পেয়েছি কিন্তু তার যেসব ভক্ত কাস্টমারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের সামনে যদি বলি; "বাবা ভাঁওতাবাজ"- নির্ঘাত গণপিটুনি খেতে হবে। তারমানে তার ভাঁওতা  প্রমান করা আমার পক্ষে সহজ হবে না।
 তাই আগে তার সাথে সাক্ষাত করবো সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমার এক উঠতি সাংবাদিক বন্ধুকে সবকিছু বললাম। ও আগ্রহ দেখাল খুব। সাংবাদিকরা এইসব প্রতিবেদনের জন্য মুখিয়ে থাকে সবসময়।

কিন্তু বিধি বাম, ক্যামেরা নিয়ে বাবার কাছে যাওয়া যাবে না। এমনকি ক্যামেরা মোবাইল বা রেকর্ডার নিয়েও যাওয়া যাবেনা। এখন আমার বন্ধুকে আমি যেভাবেই সাহায্য করি না কেন; কাজের কাজ কিছুই হবে না।
 আর যারা প্রতিবেদন পড়বে তারা ভাববে গল্পটা মন্দ হয়নি। তার মানে এটা একটা গল্প হবে, প্রতিবেদন হবে না। সুতরাং আমাকে অন্য কিছু করতে হবে। কিন্তু সেটা এখন না। তাই ভিতরে গেলাম।

অন্ধকারাবৃত সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠলাম।
আপনাদের যাদের পুরান ঢাকায় থাকার অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন- পুরান ঢাকার বেশিরভাগ বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি খুব চাপা, রাস্তাগুলোও গলির মতো আর অন্ধকারময়।
তবুও এগিয়ে চললাম। এখন জুতো খুলে ভিতরে যেতে হবে। বুঝলাম বাবার কাছাকাছি এসে গেছি। লম্বা একটা হলরুল মতো জায়গায় প্রবেশ করলাম। এতো বড় রুম আগে পুরান ঢাকায় দেখিনি। রুমের ভিতরে ধুপের ধোয়ায় সব কিছু আবছায়া। দুই পাশে সারি সারি খাদেম পাঞ্জাবি আর টুপি মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। সারির শেষপ্রান্তে মাঝখানে রাজকীয় চেয়ারে বসে আছেন বাবা। তিনি বেশ মোটাসোটা, ফর্সা এবং সুদর্শন । আস্তে আস্তে আরো লোকজনের সাথে হাটতে হাটতে তার কাছে গেলাম, এমন সময় একজন খাদেমকে সুর করে বলতে শুনলাম, "হাদিয়া হাতে হাতে রাখি, হাদিয়া হাতে হাতে রাখি।"

আমি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম,"লোকটা কী বলছে রে?"
বন্ধু বললো," বাবার জন্য উপহার এনে থাকলে হাতে রাখ, যাতে বের করতে সময় না লাগে। দেখছিস না কি ভীড়।"
কথা বলতে বলতে বাবার কাছে চলে এসেছি, তখন খেয়াল করলাম অনেকেই বাবার পায়ের কাছে রাখা  ঝুড়িতে টাকা-পয়সা রাখছে, আর বাবা সবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমরা কোন হাদিয়া দিলাম না, তবে মাথায় হাতের ছোয়া পেলাম।

দুইঃ

আমার প্রথম অনুসন্ধান ব্যর্থ হয়েছে। সুফি সাধকদের সাথে এই বাবার  কার্যক্রমের খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই কিছুই প্রমাণিত হলো না।
এবার অন্যভাবে চেষ্টা করতে হবে। একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে, তবে কতোটা কার্যকরী হবে বুঝতে পারছি না।

সকাল থেকে বসে আছি বাবার আস্তানার বাইরে। সাথে ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া আমার ভাগ্নি বসে আছে, ওর নাম দোয়া। দোয়ার হাতে খাতা আর পেন্সিল।
এখন ইচ্ছে করলেও ভিতরে যেতে পারবো না। বাবা সন্ধ্যা ছয়টার আগে  আস্তানায় বসবেন না, তাই প্রবেশ নিষেধ। এটা আমি আগে থেকেই জানতাম। তারপরেও বসে আছি, কারন আছে বসে থাকার।

আমাদের পাশেই কয়েকজন যুবক ক্রিকেট খেলছে। এতো ছোট জায়গায় ক্রিকেট খেলা যায় আগে জানতাম না। একজন বল কুড়াতে এসে বললো," এখানে কী করছেন ভাই?"
ছেলেটার বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ হবে, বেশ নাদুসনুদুস, গায়ের রঙ কিছুটা কালো।
আমি বললাম," আমি বাবার কাছে এসেছি, আমার ভাগ্নির জন্য পানি পড়া নিতে।" দোয়াকে আগেই সব বুঝিয়ে দিয়েছি, তাই ও চুপ করে আছে।
"কিন্তু বাবাতো সন্ধ্যার আগে আসবেন না।" -ছেলেটা বললো।
আমি নিতান্ত ভালো মানুষের মতো না জানার ভান করে বললাম," ভাই, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি, এখানে থাকারও কোন জায়গা নাই। আগে জানলে আরো পরে আসতাম।"
"আচ্ছা, কোন সমস্যা নাই, বসে থাকেন।"- বলে ছেলেটা হাসিমুখে বল নিয়ে চলে গেল।
আমি বসেই থাকলাম, দোয়া মনযোগ দিয়ে কী যেন লিখছে।

শেষমেশ বাবার কাছে গেলাম, বাবা কোন দিক দিয়ে প্রবেশ করলেন আমার জানা নাই, তবে কয়েকজন সাগরেদ আমার সামনে দিয়েই প্রবেশ করেছে। এরা হচ্ছে সেই খাদেম -যারা বাবার পাশে সার দিয়ে  দাঁড়িয়ে থাকে, আর বলে "হাদিয়া হাতে হাতে রাখি।"
আমি তাদের একটু পরে ভিতরে ঢুকলাম। দোয়া খাতা গুছিয়ে ব্যাগে রেখে দিয়েছে। এখানে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার কোন সুযোগ নেই, তার পরেও কিছুটা সময় নিয়ে দোয়ার ব্যাগ থেকে পানির বোতল নিলাম। বাবা তাতে ফুঁ দিলেন। আমি খেয়াল করলাম দোয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। ও এই প্রথম কোন পীর সাহেবকে দেখছে। সেদিকে না তাকিয়ে আমি আজ বাবাকে হাদিয়া দিলাম।

দোয়া বাইরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো," মামা, বাবা কিছু না জিজ্ঞেস করে পানিতে ফুঁ দিলেন কেন? আমার সমস্যা কী উনি জানেন?"
আমি বললাম,"উনারা বাবা জাতি, চোখ বন্ধ করেই সব বুঝতে পারে।"
দোয়া কি বুঝলো জানিনা, তবে মুখে বললো," ও।"

তিনঃ

আমি দোয়াকে একটা কাজ দিয়েছি। কাজটা ও নিখুঁতভাবে করেছে। এখন সেই কাজটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছি।

দোয়া বেশ কয়েকজনের ছবি একেছে, সব শেষ করে তিনটা ছবি দেখছি।
এর মধ্যে দুটো বাবার আর একটি সেই ক্রিকেটার  ছেলের। ক্রিকেটার ছেলের ছবি একেছে ছেলেটার সাথে কথা বলার সময়।
আমার ভাগ্নি দোয়া সম্পর্কে একটা কথা বলা হয়নি, ও কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই একেবারে প্রথম শ্রেণির আর্টিস্ট। যা দেখে- যেভাবে দেখে, সেভাবেই আর্ট করতে পারে। ও যেদিন আমার ছবি আর্ট করেছিল; সেদিনই সিদ্ধান্ত নেই ওকে  বাবার আস্তানায় নিয়ে যাবো।

যাহোক আমি ছবি দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেছি। পেন্সিলে আকা হলেও ছবিগুলো মনে হচ্ছে জীবন্ত ।

দোয়া বাবার একটা ছবি একেছে, যেভাবে দেখেছি সেভাবে; মানে বসা অবস্থায়। আর একটা ছবি একেছে আমার নির্দেশ অনুযায়ী ঐ ক্রিকেটার ছেলের আদলে। ছেলেটা ক্রিকেট বল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, তবে আগের ছবির সাথে পার্থক্য আছে, এই ছবিতে দাড়ি -গোফ, পাঞ্জাবি আর টুপি পড়ানো হয়েছে।
দুটো ছবির মিশেল আরকি।

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে তিনটি ছবি আসলে একজন মানুষেরই! সাদাকালো আর্ট হওয়াতে সহজে ধরতে পেরেছি, ক্যামেরায় তোলা হলে গায়ের রঙের কারনে ধরতে সময় লাগতো।

একটা বিষয় এখন পরিষ্কার, ক্রিকেট খেলোয়াড় বাকি ছেলেগুলো আসলে  বাবার খাদেম। সারাদিন যাই করুক সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় তাদের ব্যবসা।সময়টা ভালোই বেছে নিয়েছে ছেলেগুলো মুখ লুকানোর জন্য।
আমার অবস্থা দেখে দোয়া জিজ্ঞেস করলো, "ছবিগুলো সুন্দর হয়েছে না মামা। এখন আমাকে মজুরি দাও, আইসক্রিম খাবো।"
আমি মজুরি দিলাম।

কিন্তু একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না; ক্রিকেটার ছেলের গায়ের রঙ কিছুটা কালো ছিল, আর বাবার গায়ের রঙ ফর্সা। তাহলে বাবা কী ম্যাকাপ নিতেন?

উত্তরটা খুঁজতে আমি কয়েকবার বাবার আস্তানায় গিয়েছি, পাইনি। যতদূর জানি তিনি আবাস ও লেবাস দুটোই পরিবর্তন করেছেন।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস