অসমাপ্ত গল্প

মানুষের জীবন একটা টস কয়েনের মতো। যার একপাশে আছে স্বপ্ন; আরেক পাশে আছে কঠিন বাস্তবতা। কয়েন যখন যেদিকে উল্টে পড়ে সেদিকের ভাগ্য মুখ থুবড়ে পড়ে। 
তারপরও মানুষ সুখের সন্ধান করে। হয়তো সবাই সেই সুখ খুজে পায় না। তবুও খুজে বেড়ায় আজীবন...............।

মানুষ সারা জীবনে যত সুখ স্বপ্ন দেখে;  তা দেখেই চুপ করে বসে থাকে না; বাস্তবের কাছাকাছি তাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃস্বপ্ন সারা জীবনে একবার দেখাই যথেষ্ট। দুঃস্বপ্ন কেউ বাস্তবায়ন করতে চায় না -হয়ে যায়। দুঃস্বপ্নকে জীবনের কাছাকাছি আনতে হয় না, দুঃস্বপ্ন জীবনের কাছাকাছিই থাকে।


আমার বন্ধু সবুজ, পাশের গ্রাম মুন্সিনগরের ছেলে। ভদ্রতায় ওর সুখ্যাতি দশ দিক আলো করে রেখেছিল। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন একসাথে ঘুরে বেড়াতাম, স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। সারাদিন হৈ-হুল্লোর করতাম, বর্ষার ভরা নদী বা থৈথৈ করা বিলের পানিতে কলা গাছের ভেলা ভাসাতাম। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম ঘুন্টি জালে মাছ ধরা। 
আরো কতো কিছু করেছি আমরা দুজন, এখন আর অতো কিছু মনে নেই। সময়ের সাথে সাথে খেরো খাতার মত ঝাপসা হয়ে গেছে সেসব স্মৃতি।

এখন মোবাইল যতটা সহজলভ্য, মাত্র দশ বছর আগেও আমাদের কাছে তা ছিল দুর্লভ। শুধু বইয়ের পাতায় মোবাইলের ছবি দেখেই শান্ত থাকতে হত, ইন্টারনেটের দেখা পাইনি তখনো। যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নয়নের কারনে এক ঈদ ছাড়া সবুজের সাথে দেখা হতো না। শুধু সবুজ কেন; কোন বন্ধুর সাথেই দেখা হতো না। 

বেশ হাসি খুশি আর প্রান প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল সবুজের মন। কিন্তু একদিন সব ওলটপালট হয়ে গেল।
দীর্ঘ দিন সবুজের কোন খোজ পাইনি। পড়াশোনার কারনে ঢাকায় ছিলাম। একদিন ছুটিতে এসে দেখি সবুজের মা আমাদের বাড়ির রান্নাঘর সংলগ্ন ছোট্ট উঠানে চেয়ার পেতে বসে আছেন; আমার মার সাথে কথা বলছেন।

আমি সালাম দিয়ে সবুজের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে কিছুক্ষন আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।প্রথমে বলল, "তুমি কিছু জাননা!"
আমি বললাম, "কি জানবো?"

তিনি তখনো আমার দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে আছেন। আরেকবার যেই জিজ্ঞেস করলাম সবুজ এখন কোথায়? প্রথমে খুব ঝিরঝিরে অল্প কান্নার শব্দ ভেসে এলো খালাম্মার গলা দিয়ে। তারপর দুইহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে অজানা এক আশংকায় কেপে উঠলাম। তারাতারি আবার জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে সবুজের?" 

খালাম্মার কান্নার শব্দ শুনে পাশের বাড়ির চাচী, আমার চাচী আর চাচা দেখতে এসেছেন- ঘটনা কী।

কিছুটা শান্ত হওয়ার পর খালাম্মা করুন কন্ঠে বলতে শুরু করলেন সবুজের অসমাপ্ত গল্প। মায়ের আর্তনাদে বাতাস ভারী করা এমন করুণ কাহিনী জীবনে আর কখনো শুনিনি!

"সবুজ খুব অসুস্থ ছিল, আমরা বুঝতে পারিনি। ও এমনিতে খুব হাসি খুশি ছিল। কখনো কোন কারনে রাগ করেনি বা কখনো কোন কিছুর জন্য বাহানা করেনি।
সবুজের বাবা মারা যাওয়ার পর সবুজের চাচার সাথেই আবার বিয়ে হয় আমার। উনি কখনো সবুজ কে ভাতিজা হিসেবে দেখেননি, ওর বাবা বেচে থাকতেও না। সব সময় নিজের ছেলের মতো কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। সবুজও ওর চাচাকে বাবা বলে ডাকতো। তিনি কখনো সবুজকে কোন কারনে জোড়ে ধমক পর্যন্ত  দেননি। এদিক দিয়ে সবুজের কোন সমস্যা হয়নি কখনো।"

"কিন্তু তোমরা-তো তোমাদের খালুর আর্থিক অবস্থা ভালো করেই জানো। আমাকে সেলাই করে সংসার চালাতে হয়। সবুজ টাংগাইল পলিটেকনিকে পড়ত। আমরা ওর খরচ দিতে পারতাম না। এতে ওর কোন দুঃখ ছিলা না, বরং উল্টো আমাদের জন্য চিন্তা করতো। টিউশানি করে নিজের খরচ নিজেই চালাতো। টিউশানির টাকা বাঁচিয়ে গত ঈদে ওর বাবার জন্য পাঞ্জাবি আর আমার জন্য কাপড়ও কিনে এনেছিল।"

-এ পর্যন্ত বলে খালাম্মা আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমার আর সহ্য হচ্ছে না। সবুজের কি হয়েছে সেটা জানার জন্য অস্থির হয়ে গেছি। আমার মনে হচ্ছে সবুজের খুব খারাপ কিছু হয়েছে।

আমি কোনমতে জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর?"
খালাম্মা কিছুটা সুস্থির হয়ে আবার শুরু করলেন।
"শেষবার ছুটিতে এসে শুধু বলল খুব পেট ব্যথা। ও তখন খুব একটা পাত্তা দেয়নি। আমরাও বাজার থেকে ঔষধ কিনে দেয়া ছাড়া আর কোন চেষ্টা করিনি, আসলে আমরা কেউ কিছু বুঝতেই পারিনি। ওই অবস্থায়ই টাংগাইল চলে গেলো। কারো কথাই শুনলো না।"

মাঝখানে একটা কথা বলে রাখি, আমার মনে হয় সবুজ অসুখের বিষয়টা পাত্তা দেয়নি ওদের পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারনে। ওকে আমি বহুদিন থেকে জানি। কাউকে আসলে কিছু বুঝতেই দেয়নি, তাই কেউ বুঝতে পারেনি।

খলাম্মার কথায় ফেরা যাক।
"একদিন খবর আসলো সবুজের মারাত্মক পেট ব্যথা শুরু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ছুটে গেলাম হাসপাতালে। গিয়ে দেখি সবুজ অসহ্য ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছে, দুই হাতে পেট চেপে ধরে কুকড়ে যাচ্ছে।"

"ডাক্তার প্রথমে সন্দেহ করেছিল এপেন্ডিসাইটিস, কিন্তু তা না। রিপোর্টে প্রথমে জন্ডিস ধরা পড়ল। অবস্থা আরো ভয়াবহ হল পরের দিন। সবুজের ক্যান্সার ধরা পড়ল -লিভার ক্যান্সার!"

"আমি মাটিতে পড়ে কান্না করতে শুরু করলাম। ডাক্তার বলে দিয়েছে বড়জোর আর তিনদিন বাঁচবে। আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম, হাত-পা ভেঙে গেল আমার,  কি করবো আমার কলিজার টুকরার জন্য! আমি কি করবো এই তিন দিন! নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সারাদিন শুধু আল্লাহ্‌কে ডাকলাম।
একটা কথাই বারবার আল্লাহ্‌কে বললাম, "আল্লাহ্‌ তুমি আমার সন্তানকে অন্তত তিনটা মাসের জন্য ভিক্ষা দাও। আমি ওর জন্য কিছু একটা করি, আকটু আদর করার সুযোগ দাও আল্লাহ্‌।"

"কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। সবুজের পরিস্থিতি সকাল বিকাল খারাপ হতে শুরু করলো। বারবার ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেই শুরু হচ্ছে ভয়াবহ বমি। এই কষ্ট আমি মা হয়ে আর সহ্য করতে পারছিলাম না।
তিনদিনের দিন সকালবেলা শেষবারের মতো সবুজের হুশ ফিরলো। ওর মাথাটা আমার কোলে নিতে বললো, আমি নিলাম। ও ব্যথায় এখনো খুব কষ্ট পাচ্ছে।
ও আমাকে বলল, "মা তুমি কান্না করো না। আমি আল্লাহ্‌র কাছে ভালোই থাকবো। আমার এই কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না।"

"আমি সবুজের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বুঝতে পারছি ও আমকে ছেড়ে চলে যাবে।
ও আবার বলল, "মা, আমার জন্য একটু দোয়া করো মা। মা- মাগো এই ব্যথা আর সহ্য হয় না।"
-এটা বলে ও নিজেই হাত তুলে দোয়া করতে শুরু করলো, আমিও হাত তুললাম। জীবনের সবচাইতে কঠিন মোনাজাত করলাম সেদিন।"

"ও আল্লাহ্‌, জন্মদাতাকে এক টাকারও কিছু কিনে দিতে পারিনি; তার আগেই তুমি তাকে উঠিয়ে নিলে। বাবাকেও কিছু দিতে পারলাম না। মাকেও ইনকাম করে কিছু খাওয়াতে পারলাম না। তার আগেই আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আমার মাকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। তার কষ্ট তুমি ছাড়া কেউ দূর করতে পারবে না।"
সবুজ সবার জন্য দোয়া করলো। বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশি; যার কথা মনে আসলো তার জন্যই প্রান খুলে দোয়া করলো।"

তারপর বলল, "আল্লাহ্‌, তুমি আমাকে এই ব্যথা থেকে মুক্তি দাও।"

"আর কোন শব্দ পাইনি। ও আমিন বলেনি, তার আগেই হাতদুটো বুকের কাছে নেমে এসেছে। চোখের কোনে এক বিন্দু অশ্রু।
আমি সবুজের মাথা কোলে নিয়ে বসে রইলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম, "ঘুমা বাবা; নিশ্চিন্তে ঘুমা, তুই খুব ক্লান্ত।"
"আল্লাহ আমার সবুজের ডাক শুনেছে, ওর ব্যথা দূর করে দিয়েছে। আমার সবুজ আর কথা বলবে না, ও এখন ক্লান্ত- ঘুমাবে।"

-খালাম্মা এপর্যন্ত বলে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বুকে হাত রেখে বসে রইলেন ক্লান্তভাবে। তিনি এখন একটুও কান্না করছে না।

সবার মুখের দিকে তাকালাম। আমার মা আচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। চাচীর দিকে তাকালাম; তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে অশ্রুধারা। তিনিও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
যে চাচাকে আমি জীবনে কোন দিন কান্না করতে দেখিনি তাকেও দেখলাম চোখ মুছতে; তিনি আমাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন, আকাশের দিকে মুখ তুলে কিছু একটা খুঁজছেন, গাল বেয়ে নামছে উষ্ণ জলের অঝোর ধারা।

সবুজের অসমাপ্ত গল্প শুনে সবাই কাঁদছে। কাঁদতে পারছি না কেবল আমি আর সবুজের মা।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস