বেকার
প্রথম খন্ডঃ
টিউশানির আরেক নাম যন্ত্রণা!পড়াও,লেখাও,নিজে লিখে দাও,মাঝে মধ্যে ফর্ম ফিলাপ করে দাও,কিছু সময় নিজেই নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলো- ইত্যাদি ইত্যাদি।আমার চুল ছেঁড়ার ঝামেলা নেই,শুধ- পড়াই।দুই একটা নোট করে দেই মাঝেমধ্যে-এইতো।
আজ একটি রচনা লিখে দিতে হবে।বিষয়ঃ বেকারত্ব।
কী লিখবো বুঝতে পারছি না,বেশ অস্বস্তি লাগছে।কারন আমি নিজেই বেকার।বই পুস্তকে যেভাবেই লেখা থাক না কেন;যে বেকার সে নিজেও খাতার পাতায় বেকারত্বের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে পারবে না।তাই ছাত্রকে বললাম,”সিজান,আমি কাল লিখে দেবো,আজকে ভালো লাগছে না।”-কথাটা বলে বাইরে চলে এসেছি।
বেকারত্বের কারনে কথাতো জীবনে কম শুনিনি,তাই বলে কী আর এগুলো খাতায় লেখা যাবে!
আমি সুদ-ঘুষ খাবো না,-এ কথা কোন কলম লিখবে,কোন খাতা এ কথার ভার বইবে,কে-ই বা এ কথা স্মৃতিতে ধরে রাখবে?
ভাগ্য নদীর স্রোত ঠেলে চলতে পারে।কিন্তু আমার ভাগ্য এই মুহূর্তে স্রোতের সাথেও চলতে পারছে না।
আপনি কখনো লটারি জিতে টাকা পাননি এমন হয়েছে?
আমার হয়েছে,আমি লটারি জিতেছি কিন্তু টাকা পাইনি!
বেকার লোকের পদে পদে দোষ,লটারির টাকা পাইনি-এটাও না-কি আমার দোষ!একজন বলেছে,”লটারি ধরেছিস, ভালো করে ধরবি তো,ছাগল কোথাকার!”
রাতে ঘরের টিনে ভূতে শব্দ করলেও বলে আমি করেছি!
ভালো কথা বলতে গেলেও আজকাল লোকে আড়াল আবডাল ছেড়ে সরাসরি পণ্ডিত বলে ডাকে।বুঝতেই পারছেন এই পণ্ডিত মানে শিক্ষক না।কারনটা সহজ;বেকার লোকের মূল্যবান কথা আর ছাগলের ম্যা ডাকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই!বেকার লোকের ঘুমও এক প্রকার অপরাধ কিন্তু চাকুরীজীবী লোক ঘুমিয়ে থাকলে সম্রাট আলেকজান্ডারের ঘুম!
চুরি করাও একটা পেশা।আপনি যদি কাউকে বুঝাতে সক্ষম হন যে আপনি বেকার নন,আর বলেন,“আমি এই মাত্র চুরি করে এসেছি।”তবে সে খুশির চোটে কেঁদেও ফেলতে পারে,আবার হয়তো বলেও বসতে পারে,”বাহ!আপনি এতো সুন্দর করে চুরি করতে পারেন!
দ্বিতীয় খন্ডঃ
১৮ জুলাই ২০১৬,বিকেল তিনটাঃ
আজ দেশের স্বনামধন্য একটি গার্মেন্টসে ভাইবা দিতে এসেছি।অফিস এতোটাই জাঁকজমকপূর্ণ যে আমি হতবাক হয়ে শুধু অফিস দেখছি!সবাই যার যার মতো কাজে ব্যস্ত।কেউ কাউকে বিরক্ত তো দুরের কথা; জোরে কথা পর্যন্ত বলছে না কেউ।কী সুন্দর আর স্মার্ট লোকগুলো।বাংলা,ইংরেজি,হিন্দি যখন যেটা প্রয়োজন সেই ভাষাতেই কথা বলছে।আমি বড় বড় চোখে সব কিছু দেখছি।
কেউ যদি তখন আমাকে লক্ষ্য করে থাকে তবে সে নিশ্চিত বলেছে “ছেলেটা খ্যাত” জীবনে কিছুই দেখেনি!
সকাল দশটার দিকে একটা রুমে আমাকে কম্পিউটারে কিছু কাজ দেয়া হয়েছিল,কাজ করবো কি ঘোড়ার ডিম;পরিবেশ দেখেইতো শখ মিটছে না!সবখানে এসি,প্রচন্ড গরমেও ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ।এতো উন্নত পরিবেশ জীবনে দেখিনি।মনে হলো নিউইয়র্কে বেড়াতে এসেছি।তাজ্জব হওয়ার তখনো বাকি আছে।
দুপুর বেলা ডাইনিং-এ নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে।
আমি এখানে আসার সময় দুটি বিশাল ডাইনিং দেখেছি।নীচতলার রুমে লেখা “অফিসার্স ডাইনিং” দোতালার রুমে লেখা শুধু “ডাইনিং”।আমি অফিসার্স ডাইনিং-এ খাইনি।সাধারণ ডাইনিং-এ খেয়েছি,তাতেই মনে হলো ডাইনিং তো নয়;যেন থ্রি স্টার হোটেল।খাবার খেয়ে মনে হলো ঘরে বসেই খাচ্ছি,এতোটাই রুচিসম্মত।পরিবেশটাও বেশ আরামদায়ক।
খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি এমন সময় সত্যিকারের তাজ্জব বনে গেলাম।একটা জিনিশ আগে খেয়াল করিনি,দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
এই অফিসে কোথাও লেবারদের জন্য ডাইনিং নেই!তারা কোথায় বসে খাবার খায় আমি জানি না।
কিছুক্ষন খুজতেই দেখতে পেলাম একটা গলি মতো জায়গায় কাপড় বিছিয়ে কয়েকজন আরাম করে খাবার খাচ্ছে।প্লেট নেই,সবার হাতেই টিফিন বক্স বা বাটি।
তবুও ওরা তৃপ্ত,ওরা শান্ত,কারন ওরা শ্রমিক!
অন্য কোন গলিতেও হয়তো কেউ না কেউ তৃপ্তি করে খাবার খাচ্ছে।কে রাখে তার খবর।
এমন সময় দরজার ফাক দিয়ে যা দেখালাম,তাতে সারাদিনের সুখকর আমেজ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেলো আমার!শ্রমিকরা কাজ করছে আমার দেখা সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে!
বিদ্রোহী একটা ভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আমার।বিদ্রোহী কবিতা লিখতে ইচ্ছা করছে।কিন্তু আমি অতো বড় কবি নই।আমি লিখতে পারছি না বটে কিন্তু বুঝতে পারছি;কাজী নজরুল ইসলাম এমনি এমনি বিদ্রোহী কবি হননি।
শ্রমিকের হাতে কড়া পরে মেশিনের চাকা ঘুড়িয়ে।গায়ের রঙ কালো হয় মেশিনের কালিতে।অসুখ হয় ঘাম শুকানোর জন্য এসি নেই বলে।
এর কারন একটাই নিম গাছ যতো উপকারীই হোক না কেন;কেউ তাতে পানি দেয় না,পানি দেয় ফলবতী গাছে!কারন ঐ একটাই-সে ফল দেয়।
শ্রমিকরা তো আর কলমের খোঁচা বোঝে না,তাই ওদের পার্থক্যের খোঁচাই সহ্য করতে হবে!
খাবার খেতে থাকা শ্রমিকদের পাশে একটা সিঁড়িতে বসে পড়লাম।কবিতা লিখতে না পারি তো কি হয়েছে;রচনাতো লিখতে পারি না-কি।আমি এখন আমার ছাত্র সিজানের জন্য রচনা লিখবো।সিজান এখন বুঝতে পারলেই হলো!
বেকারত্ব
ভূমিকাঃ
শুধু কর্মহীন মানুষকেই বেকার বলে না,অকেজো কর্মকেও বেকার বলে!আদর্শের জন্য,ছোট কাজকে সম্মান দেখানোর জন্য,সুদ-ঘুষ না খাওয়ার জন্য যদি বেকার থাকতে হয়,তবে বেকারত্বই তোমার জন্য সবচাইতে বড় চাকরি……………!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন