অজাত কচু


প্রথম খন্ডঃ

কিছুদিন যাবত আমি অসুস্থ।ডাক্তারের কাছে এসেছি-হোমিও ডাক্তার।সম্পর্কে তিনি আমার মামা হন।ডাক্তার হিসেবে যেমন তার সুখ্যাতি আছে তেমনি পাগলামির জন্যও সুখ্যাতি আছে।

পাগল লোকেরা সাধারণত জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়।তার জ্ঞানের ভান্ডারের একটা উদাহরণ দিচ্ছিঃ
একবার মামার উপর একটা কাজের দোষ চাপাতে না পেরে বলেছিলাম,"মামা এক হাতে কিন্তু তালি বাজে না।"
মামা বলেছিল," একহাতে তালি বাজে না-কথাটা ঠিক না,খারাপ লোক একহাতেও তালি বাজাতে পারে।সেই আওয়াজ হয়তো কেউ শুনতে পায় না।তার থেকেও বড় কথা হচ্ছে এক হাতে তুড়ি বাজে,যা হাত তালির থেকেও খারাপ অর্থ বহন করে!"
সেদিন থেকে আমি মামার বিরাট ভক্ত।আজকে অবশ্য ভক্তি দেখাতে আসিনি;এসেছি ঔষধের জন্য।

আমি বললাম,"মামা,আমার প্রচন্ড ঠান্ডা লেগেছে,নাক দিয়ে রক্তও ঝরছে।"

মামা হোমিওপ্যাথির উপর লেখা একটা বই পড়ছেন।তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলেন,"এখনো রক্ত ঝরছে?"
আমি বললাম,"না,তবে খুব দুর্বল লাগছে।"
মামাঃচলে যা।
"কোথায় যাবো?"
"বাড়ী চলে যা।"
"দেখবেন না?"
"না।"
"ঔষধ দেবেন না?"
"না।"
"কেন?"
"অসুখ তো এমনিতেই ভালো হয়ে গেছে,ঔষধ দিয়ে কী করবি?"

মনে মনে ভাবলাম;বলে কি এই পাগলে!
মুখে বললাম,"আমি খুব দুর্বল,সেটার কী হবে?"
তিনি খুব বিরক্ত হয়ে আমার দিকে কপাল কুচকে তাকিয়ে বললেন,"দুর্বলতা কোন অসুখ না।তিন বেলা অজাত কচু খাওয়ার অভ্যসা কর,সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"কোথায় পাবো অজাত কচু।"
"সবখানেই পাবি।এখন যা ভাগ বিরক্ত করিস না।"



কয়েকদিন কচু খেয়েছি।আমি এখন সুস্থ,বিশ্বাস করুন আর নাই করুন;অজাত কচু খেয়েই ভালো হয়ে গেছি,দুর্বলতা কেটে গেছে!
যেখানে সেখানে পাওয়া যায় বলে অজাত কচুকে অবহেলা করার কোন উপায় নেই।পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই কচু।নামে অজাত হলেও কাজে কিন্তু জাতের!


দ্বিতীয় খন্ডঃ

আমার এক আত্মীয় পেশায় আইনজীবী।খুব ব্যাস্ত মানুষ,তাকে সহজে পাওয়া মুশকিল।বহুবার তার কাছে ধর্না দিয়েছি;কাজ হয়নি।
অনেক কষ্টে তাকে আজ পেয়েছি।ফোন করে অফিসে আসতে বলেছে আমাকে।মামলা-মোকদ্দমার জন্য না; আমি এসেছি একটা চাকরির ব্যপারে কথা বলতে।
বেসরকারি একটা এনজিওতে উনার খুব প্রভাব।এক কথাতেই চাকরি হয়ে যাবে।আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তার কাছে এসেছি।তিনি আমাকে দেখা দিলেন বহু সময় অপেক্ষার পর।আসলে তিনি খুব ব্যস্ত মানুষ,তাই দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়েছে।
তিনি আমার সামনে বসেই কাকে যেন ফোন করলেন।অপর পাশ থেকে সাড়া পেয়ে বললেন,"কালাম সাহেব,একটা ছেলের কথা বলেছিলাম;মনে আছে?ছেলেটাকে পাঠাচ্ছি,আমার ছোট ভাই।একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।"

খুশি হয়ে এনজিওর দিকে রওয়ানা দিলাম।মনে অনেক ধরনের আশা জাগছে।
অফিসিয়াল ড্রেস পরে কালাম সাহেবের সাথে দেখা করলাম।উনি এখানকার ম্যানেজার।তিনি খুব খাতির করলেন।
তিনি জানালেন তাদের একজন কর্মী দরকার।আমাকে দুদিন পরে ডাকবে।
কথাবার্তা বলে চলে যাচ্ছি।দরজার বাইরে মাত্র পা রেখেছি এমন সময় আমার স্কুল জীবনের বন্ধু তারিকের সাথে দেখা হয়ে গেলো।ওকে দেখে খুব ভাল লাগছে।এভাবে দেখা হবে আশা করিনি।
তারিক আমাকে দেখেই বলল,"কিরে তুই এখানে?কতদিন পর দেখা,এখানে কার কাছে এসেছিস?আচ্ছা পরে কথা হবে-আগে আমার বাসায় চল।"
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই টানতে টানতে বাসায় নিয়ে গেলো।চা পান করার সময় অনেক ধরনের কথা হল আমাদের।পুরনো,নতুন সব ধরনের কথা।তারিকের কথাও শুনলাম।
তারিক ওই এনজিওতেই চাকরি করে।

এখানে কেন এসেছি শোনার পর তারিক খুব গম্ভীর হয়ে বলল,"বন্ধু আমাদের এনজিওতে কোন পোষ্ট খালি নেই।তোকে মিথ্যা বলা হয়েছে।"
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,"তাহলে যে ম্যানেজার সাহেব বলল পোষ্ট খালি আছে!"
তারিকঃতোকে ব্যস্ত রাখা দরকার ব্যস্ত রেখেছে।যাতে বুঝতে পারিস তোর জন্য কেউ অন্তত কিছু একটা করার চেষ্টা করছে।তোর ফোন কলার এরকম আগেও করেছে।আমি না বললে হয়তো কোনদিন জানতেও পারতি না এসব গোপন কথা।

পরে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি তারিকের কথা সত্য।খুব লজ্জা লাগছে,এভাবে আগে কোনদিন অপমান করেনি কেউ।কিছুক্ষণ আগেও স্বপ্ন দেখছিলাম। প্রথম মাসের বেতন দিয়ে কাকে কি কিনে দেবো,কি কি করবো,আরো কতশত!

আমি মামার চেম্বারে মাথা নিচু করে বসে আছি।কিছুক্ষণ আগে তাকে সব বলেছি।
হঠাৎ খেয়াল করলাম মামা চশমার ফাক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,"হাসছেন কেন?"
মামা বলল,"অজাত কচু সবখানে জন্মায়-এটা জানতাম।তাই বলে সবকিছুতে জন্মাবে এটা আশা করিনি!"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস