পাইলট অর্থ বিড়ি!


একঃ
আমার ছোট ভাই লিটন,ক্লাস সিক্সে পড়ে।ওর চলাচলের জন্য রাস্তা বা দরজা কোনটাই দরকার হয় না!চটপটানিতে এতোটাই গতিশীল যে;ওর গতির চোটে আমাদের বাড়ির ইঁদুর পর্যন্ত ভেগেছে!  এজন্য ওর নামের শেষে বিশেষণ বসেছে অনেক।কেউ বলে বিটল,কেউ বলে তারকাটা,কেউ বলে হুলো!

একটা উদাহরণ দিচ্ছিঃ
একবার আমি আমার স্যারের সাথে কথা বলছি,"স্যার আমার যেন কী হয়েছে, maybe I am in love."
লিটন আমার সাথে ছিল।তখন চুপ করেছিল,বিকেল থেকে শুরু হলো ওর প্রশ্নবাণ।
লিটনঃকে
"কী,কিসের কে?"
লিটনঃমেয়েটা কোথাকার?তোমার সাথে পড়ে নিশ্চই?
"কোন মেয়ে?"
লিটনঃতুমি যার প্রেমে পড়েছ।
"আমি আবার কার প্রেমে পড়লাম!"
লিটনঃওই যে বললে,I am in love.

আমি অবাক হইনি,বিস্ফোরিত হয়েছি!ও সারা জীবনেও ইংরেজি রিডিং পড়তে পারেনি,অথচ ইংরেজির অর্থ বুঝেছে!
আমি বোকার মতন হাসছি,আমার সাথে সাথে লিটনও হাসছে।এখন আমি ওর সাথে দেখা হলেই হাসি,লিটনও ভুরু নাচায় আর হাসে।হেহ হেহ হেহ হেহ!

ওকে বোকা বানাতে হবে,কিন্তু কীভাবে?আমি নিশ্চিত ওর সাথে অন্তত বুদ্ধিতে পারবো না।ও পড়াশোনাতে গোবরগণেশ-এইটাই আমার একমাত্র আশা।এখন দেখা যাক কি করত্র পারি।

দুই তিন দিন এভাবে চলার পর একদিন বললাম, "তুই একটা বোকা,"
ও বলল," কেন?"
আমি লিটনকে বুক শেল্ফ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা বের করতে বললাম।তার পর বললাম, "ওই উপন্যাসে লেখা আছে;
             ফর গড সেক
            হোল্ড ইউর টাং
            এন্ড লেট মি লাভ।
"আমি এই ডায়ালগ দিয়েছি,কোন মেয়ের কথা বলিনি।বই দেখে মিলিয়ে নে।"

লিটন খুব জোরে জোরে হাসছে আর বলছে,"আমি কত বড় বোকা।হেহ হেহ হেহ!"
আমিও হাসছি-এই ভেবে যে এ যাত্রা বেচে গেছি।এই জীবনে প্রথমবার ওকে বোকা বানাতে পেরেছি।তবে কয়দিনের জন্য আল্লাহ-ই জানে!

দুইঃ
আমি সাধারণত লিটনকে পড়াই না।ওকে পড়াতে গেলে দশ মিনিটেই আমার ব্যাটারি লো হয়ে যায়।তারপরেও আজ সাহস করে পড়তে বসিয়েছি।

"বাবা মা অসুস্থ হলে আমরা কী করবো?"
লিটনঃবাবা-মার সেবা করবো,প্রয়োজনে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।জ্বর হলে মাথায় পামপট্টি দেবো।"

"ওইটা পামপট্টি না গাধা- জ্বলপট্টি!"
লিটনঃভাইয়া এটা বাদ দাও;কাল ইংরেজি পরিক্ষা।তার চাইতে বরং আমাকে কয়েকটা ইংরেজি অর্থ বলে দাও।"
আমি বলছি,"ফার্মার মানে কৃষক,কম্পিউটার মানে গণনাকারী যন্ত্র,পাইলট মানে,,,,,,?
"ভাইয়া পাইলট মানে আমি জানি।"
"কী?"
লিটনঃপাইলট মানে বিড়ি!

হাসি কান্না দুটি একসাথে পাচ্ছে আমার।
তারপরেও ওকে শাসন করতে পারছি না।কারন পাইলট নামে সত্যিই সিগারেট আছে।ও যদি এখন বলে স্টার বা ব্লাক অর্থ বিড়ি তাহলেও উত্তর সঠিক!
লিটনকে ভাগ্যেত হাতে ছেড়ে দিলাম,ওর পড়া ও একাই পড়ুক।


আমি লেখালেখি করি এই বিষয়টা গোপন রেখেছি।কেউ জানতে পারলে অযথাই সমালোচনা করবে।তার থেকে না জানাই ভালো।কিন্তু বিষয়টা কেমন করে যেন লিটন জেনে গেছে।

জানার সাথে সাথেই শুরু হলো সমালোচনা।
এখনকার মশাগুলো কয়েলে ভয় পায় না, হেলিকপ্টারের মতো আওয়াজ করে উল্টো ভয় দেখায়।কামড় দিলে মনে হয় গুলি করছে।
মশা মারতে কামান লাগেনা ঠিকই তবে কামান চালানোর দক্ষতা লাগে।আমি এখন সেই চেষ্টাই করছি।

মশারি টাঙিয়ে ভিতরে বসে মশা মারছি;এমন সময় লিটন এসে বলল,"তুমি তো দেখছি মশাও মারতে পার না।তাও আমার লেখক হয়েছো।"

আমি বললাম,"তা কিভাবে মশা মারতে হয় শুনি;মশা মারা কেরানি সাহেব!"

ও বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে বলে চলল,"
সারারাত মশা মারার চাইতে মশারী টাঙিয়ে একপাশ উচু করে ভিতরে বসে থাকো।মশা তোমাকে কামড়াতে আসবেই।সব মশা ভিতরে ঢুকে গেলে আস্তে করে বেড়িয়ে যাও।তারপর পুরো মশারী গুটিয়ে তার উপর দাঁড়িয়ে তিড়িংবিড়িং করে কিছুক্ষণ নাচো!ব্যস,কেরানি থেকে মশা মারা হিরো হয়ে গেলে!"

আমি বড় করে একটা নিশ্বাস ছাড়লাম।
লিটনের সেদিকে খেয়েল নেই,ও বলে চলেছে,"আচ্ছা ভাইয়া তুমি তো লেখক হয়েছ।আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে,ব্যতিক্রম কিছু করলে কেমন হয়?এই ধরো লাইভ লেখালেখি।"

লিটনের আইডিয়া মানে ভয়াবহ কিছু হবে।ক্যাট অর্থ ছাগলও হতে পারে।তাই নিরুত্তাপ গলায় জিজ্ঞেস করলাম,"কীরকম আইডিয়া?"

"যদি এমন হয় তবে কেমন হয়;
ধরো,বইয়ের পরিবর্তে লাইব্রেরীতে সরাসরি বসে থাকবে তুমি।আমাদের চাহিদার উপর লাইভ গল্প লিখে দেবে!"
তুমি বলবে,"বলুন স্যার আপনার কী গল্প পড়তে ইচ্ছা করছে?"
"আমার এখন ভূতের গল্প পড়তে ইচ্ছা করছে।"
তুমি বলবে,"ঠিক আছে স্যার,পঁচিশ মিনিট সময় আর ঊনপঞ্চাশ টাকা লাগবে।"
"ত্রিশ টাকায় রাজী আছেন,সময় ১৫ মিনিট?"
তুমি বলবে, "না,হবে না।অন্য কোথাও দেখুন।"
"ঠিক আছে অন্য কাউকে দিয়ে লেখিয়ে নিচ্ছি।"
তুমি বলবে,"দাড়ান স্যার গল্প নিয়ে যান;লিখে দিচ্ছি।গল্পে কী আপনার কোন চরিত্র থাকবে?"

আর সহ্য করা যায় না,তেড়ে গেলাম ঝড়ের গতিতে কিন্তু লিটনের গতি উল্কার সমান।পালিয়েছে!


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উচিৎ শিক্ষা

দর্শনঃমোল্লা নাসিরুদ্দিনের ফুঁ

বাঘা বাতাস