ফুলস্টপ
একঃ
শতভাগ সত্য বলে কিছু নেই।নিরানব্বই ভাগ সত্যও এক প্রকার মিথ্যাচার।সত্যের সাথে পারসেন্ট লাগানো মানে সত্যের গায়ে মুখোশ পড়িয়ে দেয়া।
শক্ত করে সমাজের মুখে এটে বসা সেই মুখোশ আমি খুলতে পারবো না।
তাই আজ একটা সত্য ঘটনা লিখতে বসেছি।এই সত্য পৃথিবী পালটে দেয়ার মতো কিছু না,আমার জীবনের ছোট্ট একটা ঘটনা মাত্র।ঘটনার আয়তন ফুলস্টপের সমান।
যে সময়ের কথা বলছি তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি।
ইংরেজি পরিক্ষা হচ্ছে আমার কিন্তু কিছু লিখতে পারছি না।সারা বছর কি পড়েছি তাও ভুলে গেছি।যে ধরনের প্রশ্ন এসেছে; জীবনে শুনেছি বলেও মনে হচ্ছে না। স্যার কড়া চোখে দেখছেন আমাদের।মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করছেন কাগজ লাগবে কি-না।
কাগজ দিয়ে কি করবো?যে কাগজ আছে তাই তো শেষ করতে দফারফা হয়ে যাবে।শেষে না বেচে যাওয়া কাগজ ছিঁড়ে ঝালমুড়ি খেতে হয়!
আমি বারবার পৃষ্ঠা উলটপালট করছি; আর যাও একটু লিখেছি ঘুরেফিরে সে-গুলোর উপর দিয়েই কলম ঘষছি।খুব লিখছি- এরকম একটা ভাব নিয়ে বাক্যের শেষে দেয়া ফুলস্টপ গুলোকেই আকারে বড় করছি।হঠাৎ আবিষ্কার করলাম নকল করতে যোগ্যতা লাগে,কিন্তু সেই যোগ্যতা আমার নেই!
কোনরকমে লেখা শেষ করে খাতা জমা দিলাম।আমি নিজে যদি শিক্ষক হয়ে এই খাতা দেখি;তবে ছাত্রকে কাবাব বানিয়ে খেয়ে ফেলতে চাইবো!
কেউ না জানুক আমি অন্তত জানি ফল কি হবে।
ধান লাগিয়ে কেউ সেই ক্ষেত থেকে গম তুলেছে বলে কখনো শুনিনি!আমার রেজাল্টও তাই হবে।
রেজাল্ট দেয়ার দিন সকালবেলা; আমাকে অফিসে ডেকে নেয়া হলো।
কি অপমান আছে কপালে জানি না।আমাদের স্কুলে বিশাল অডিটোরিয়াম আছে।কেউ অপরাধ করলে বা পরিক্ষায় ফেল করলে তাকে অডিটোরিয়ামের বিশাল স্টেজে ওঠানো হয়।তারপর সব লাল বাতি জ্বালিয়ে কানে ধরে ওঠবস করানো হয়।সেই নাটক মঞ্চস্থ হয় ত্রিশ জন শিক্ষক,দশ-বারো জন দপ্তরী আর দুই হাজার ছাত্রছাত্রীর সামনে!
তবে আশার কথা আমি এখন অডিটোরিয়াম হলে না;দাঁড়িয়ে আছি হেড স্যারের সামনে।
ইংরেজি ম্যাডামও আমার পাশে অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।দেখে মনে হচ্ছে হেড স্যার তাকেও আজ মারবে।একটু একটু হাসি পাচ্ছে আমার,কিন্তু ভয়ে হাসতে পারছি না।
হেড স্যারে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থেকে টেনে টেনে প্রথম প্রশ্ন করলেন,"বাবা তুমি কষ্ট করে প্রথম হয়েছ।আমি তোমাকে কী উপহার দেবো?"
আমি চুপ করে রইলাম।কারন ফেল করে প্রথম হওয়ার উপহার কি হতে পারে তা আমি জানি না।
"তোমার ম্যাডামেরও একটা উপহার পাওনা রয়েছে।দুজনকে এক সাথে উপহার দিলে কেমন হয়?"-স্যার আবার জিজ্ঞেস করলেন।
না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম স্যার আমার দিকে বাঘের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
"ঠিক আছে যাও বাবা;আমি দেখছি তোমাদের কী উপহার দেয়া যায়।"-এই বলে চলে যেতে বললেন।
আমি ভয়ে অস্থির হয়ে গেলাম।খাসি মেরে তো আর বিরিয়ানি খাওয়াবে না!উপহার যে কঠিন কিছু হবে তাতে আর সন্দেহ নেই।আমি নিশ্চিত কপালে আজ অডিটোরিয়ামের লাল বাত্তি জ্বলবে!
বারান্দায় এসেছি এমন সময় শুনতে পেলাম হেড স্যার ম্যাডামের উপড় চড়াও হচ্ছেন,"ঘোড়ার ডিম পড়ান,ঘাস কাটেন সারাদিন,মশা মারেন ক্লাসে।ফেল-এরও একটা মানইজ্জত আছে।সাতাশ পেয়ে প্রথম হয়েছে হারামজাদা।আপনার চাকরি তো গেছেই,সাথে আমারটাও খেয়েছেন।"
তারপর আর কিছুই শুনতে পেলাম না।ক্লাসে এসে চুপ করে বসে রইলাম।হেড স্যার মনে হয় এখনো ম্যাডামের সাথে হালুম হালুম করছে।
এক ভয় কাটতে না কাটতেই আরেক ভয় মনের মধ্যে বাসা বাধতে শুরু করেছে।আমি ম্যাডামকে চিনি,তিনি ক্লাসে এসে যে গগনবিদারী চিৎকার দেবেন তাতেই আমার এখন প্যারাসিটামল খেতে ইচ্ছা করছে!
আমি জানালার ফাক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছি;ম্যাডামের হাতে কোন বেত আছে কি-না।নাহ নেই।
তারপরেও কেন জানি ভয় আরো বাড়ছে।
বেত যখন নেই তাহলে আজ নিশ্চিত ক্লাসের সবার জন্য টিসি নিয়ে আসছেন।
ম্যাডাম ক্লাসে প্রবেশ করলেন,"বাবা,কী খবর তোমার?"-এই কথা বলে আমার গালে চিমটি কাটলেন।কি যে আদর করলেন তা আর বলে বোঝানোর দরকার নেই।মনে হলো আমি কিন্ডারগার্টেনে পড়ি।
এরপর শুরু করলেন বেধড়ক মার।বেত ক্লাসেই ছিল-আমি খেয়াল করিনি।তিনি ঘুরে ঘুরে শুধু আমাকেই মারলেন।হয়রান হয়ে গেলে জিরিয়ে জিরিয়ে মারলেন।
"তুই ফেল করলি কেন?"-এই কথা বলে আর গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হয়।ক্লাসের আর কেউ সেদিন মার খায়নি,আমি একাই সবার মার খেয়েছি।
রাগে দুঃখে লজ্জায় সেদিন টিফিন পর্যন্ত খেতে পারিনি।
এখনো মনে;আছে আমি তিন চারদিন গোসল করিনি-এই ভয়ে যদি কেউ মারের দাগ দেখে ফেলে!
দুইঃ
অপ্রিয় সত্য বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই।সত্য যদি কারো কাছে অপ্রিয় মনে হয় তবে সে অপরাধী।কিন্তু কি করবো; মিথ্যা শুনতে শুনতে কান এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে,একসাথে অনেক সত্য শুনলে আমাদের কান বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে।তখন সত্যকে মিথ্যা বলেই মনে হয়।
লাল মিয়া মাটি কেটে সংসার চালায়।রোজকার মতো আজকেও সে ফজরের আজানের সাথে সাথেই বিছানা ছেড়েছে।হাত মুখ ধুয়ে কোদাল হাতে আধো অন্ধকারে হেটে রওয়ানা হয়ে গেছে নদীর পাড়ের দিকে।লাল মিয়ার বাড়ী থেকে জায়গাটা খুব বেশি দূরে না।আজ নদীর পাড়ে মাটি কাটবে দুপুর বারোটা পর্যন্ত।আরো তিনজন আগেই সেখানে উপস্থিত হয়ে গেছে।
মাটি কাটা শুরু করার আগে তাদের রোজকার অভ্যাস বিড়ি ফুঁকা,আজকেও ফুঁকছে।
বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে লাল মিয়া আলী মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,"বুঝলা আলী বাই,আইজ-কাইল শইলডা বেশি ভালা যায় না।কাম করতে মনে চায় না।"
"কি আর করবা বাই,"আলী মিয়া বলে।
"আমাগো কাম মরার আগে আর শ্যাষ হইবো না।তোমার ব্যাটা পুত্তুর নাই,কাম কইরাই খাইতে হইবো।"
এই কথাটা শোনার পর লাল মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
তারা কাজ করে আর নিজেদের নানান ঘটনা নিয়ে আলোচনা করে।দুঃখের ঘটনা,হাসির ঘটনা,মজার ঘটনা।এভাবেই দিন কেটে যায় তাদের।
মাটি কাটা চারজনের দলে আনিস বয়সে সবার ছোট।ওর আগ্রহ এবং ভয় দুটোই খুব বেশি।মাটি কাটতে কাটতে ও একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে।সবাইকে ডেকে সেই জিনিসটা এখন দেখাচ্ছে।
আমি ইদানীং এই সময় স্কুলে যাই,আজকেও যাচ্ছি।
আমার ভাগ্য ভালো স্কুল থেকে টিসি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়নি।
সামনে ভাল রেজাল্ট করবো-এই প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর মাফ করে দিয়েছে।প্রাইভেট টিচারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার জন্য।তাই সকাল ছয়টার দিকে আমি সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছি নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে।এমন সময় আলী ভাইদের উৎসাহী কথাবার্তা শুনে সাইকেল থামালাম।
আবিষ্কৃত জিনিসটি একটা কাফনের কাপড়।আনিস বেশ ভয় পেয়েছে কাফনের কাপড় দেখে।ভয়ের আসল কারন কাপড়টা নতুন!
আলী আর লাল মিয়া দুজনেই বয়স্ক,তারা নানান জিনিস দেখে অভ্যস্ত।মাটি থেকে অনেক কিছুই বেরোয় -এতে ভয়ের কিছু নেই।তাদের জীবনে তারা এরকম বহুবার দেখেছে।
কিন্তু নির্ভীক আলী মিয়াও আজ ভয় পেয়েছে-দারুন ভয়!
অতি উৎসাহী আনিস কাপড় টানতেই বেড়িয়ে এসেছে ছোট্ট তুলতুলে একটা হাত!পুরোটা টানতেই বেড়িয়ে এসেছে সদ্যজাত বাচ্চার লাশ!ফুটফুটে একটা বাচ্চা,বেশিক্ষণ হয়নি দাফন করা হয়েছে।
সত্যি বলতে দাফন বা কবর কোনটাই করা হয়নি-স্রেফ পুতে রাখা হয়েছে।কিন্তু এখানে কেন?এই নদীর পাড়ে!এটা তো কবরস্থানও না!
সবাই মিলে তাড়াতাড়ি আবার বাচ্চাটাকে মাটি চাপা দিয়ে রেখে চলে যাচ্ছে।এতোটুকুই যথেষ্ট,আর ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছা কারো নেই।আমাকে দেখে আলী ভাই বলল,"শিগগির পলা ছোট ভাই।এইহানে থাকার দরকার নাই,স্কুলে যা তাড়াতাড়ি।"
অন্যদের বলল,"আইজ আর কামের দরকার নাই।বেবাকে বাড়ী যাও।"
আনিসও তাড়া দিল,"তাড়াতাড়ি ভাগো চাচা।আগে জানবার পারলে এই পাড়ে পাও দিতাম না-কি কোন কালে।জন্মের তরে তওবা কাটলাম;মাটি কাটা কাম আর না।"
কিন্তু লাল মিয়ার নড়বার লক্ষণ নেই।সে ভয় পায়নি,অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছোট্ট গর্তটার দিকে।এতোটুকু বাচ্চা কার এমন ক্ষতি করেছে যে কবরেও জায়গা হলো না!
লাল মিয়া নিঃসন্তান।কতো কেঁদেছে একটা বাচ্চার জন্য অথচ এই বাচ্চাটা মানুষের কাছে বেশি হয়ে গেলো!
বাচ্চাটার পরিচয় পর্যন্ত জানতে পারবে না কেউ।জানার অবস্থায় থাকলে কবরস্থানেই ওর তুলতুলে দেহটার জায়গা হতো।এটাই সত্য কথা।
চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো লাল মিয়া আর তার দল।
বাচ্চাটা একা পড়ে রইলো নদীর পাড়ে, সবার পিছনে-অচেনা এক জগতে।ওটাই ওর ঘর-ওটাই ওর বিছানা।
আমি একা একা ভাবছি;ঐ ছোট্ট অন্ধকার গর্তে কীভাবে থাকবে ফুটফুটে শিশুটা,কিভাবে বইবে এতো মাটির ভার;ওর ঐ ছোট্ট দেহটি।ভাবতে ভাবতে সবার মতো আমিও চলে যাচ্ছি।সাইকেলের পেডালে চাপ বাড়ালাম।সামনের রাস্তা কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে-কিন্তু এখন শীতকাল না।লাল মিয়ার মতো আমার চোখেও পানি জমতে শুরু করেছে মনে হয়।
দীর্ঘ দিন পর লিখতে বসা আজ আমি আর সেই ছোট্টটি নেই,অনার্স কমপ্লিট করেছি।অনেক বড় হয়ে গেছি কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনা ভুলতে পারিনি।এই ঘটনা থেকে আমি শিখেছি;সমাজ নিজেই একটা নিস্তব্ধ কবর।আরো শিখেছি শুধু খাতার পাতায়ই ফুলস্টপ হয় না,এই অন্ধকার সমাজের প্রতিটা বাকে বাকে কারো না কারো জন্য অপেক্ষা করছে ফুলস্টপ!
শতভাগ সত্য বলে কিছু নেই।নিরানব্বই ভাগ সত্যও এক প্রকার মিথ্যাচার।সত্যের সাথে পারসেন্ট লাগানো মানে সত্যের গায়ে মুখোশ পড়িয়ে দেয়া।
শক্ত করে সমাজের মুখে এটে বসা সেই মুখোশ আমি খুলতে পারবো না।
তাই আজ একটা সত্য ঘটনা লিখতে বসেছি।এই সত্য পৃথিবী পালটে দেয়ার মতো কিছু না,আমার জীবনের ছোট্ট একটা ঘটনা মাত্র।ঘটনার আয়তন ফুলস্টপের সমান।
যে সময়ের কথা বলছি তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি।
ইংরেজি পরিক্ষা হচ্ছে আমার কিন্তু কিছু লিখতে পারছি না।সারা বছর কি পড়েছি তাও ভুলে গেছি।যে ধরনের প্রশ্ন এসেছে; জীবনে শুনেছি বলেও মনে হচ্ছে না। স্যার কড়া চোখে দেখছেন আমাদের।মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করছেন কাগজ লাগবে কি-না।
কাগজ দিয়ে কি করবো?যে কাগজ আছে তাই তো শেষ করতে দফারফা হয়ে যাবে।শেষে না বেচে যাওয়া কাগজ ছিঁড়ে ঝালমুড়ি খেতে হয়!
আমি বারবার পৃষ্ঠা উলটপালট করছি; আর যাও একটু লিখেছি ঘুরেফিরে সে-গুলোর উপর দিয়েই কলম ঘষছি।খুব লিখছি- এরকম একটা ভাব নিয়ে বাক্যের শেষে দেয়া ফুলস্টপ গুলোকেই আকারে বড় করছি।হঠাৎ আবিষ্কার করলাম নকল করতে যোগ্যতা লাগে,কিন্তু সেই যোগ্যতা আমার নেই!
কোনরকমে লেখা শেষ করে খাতা জমা দিলাম।আমি নিজে যদি শিক্ষক হয়ে এই খাতা দেখি;তবে ছাত্রকে কাবাব বানিয়ে খেয়ে ফেলতে চাইবো!
কেউ না জানুক আমি অন্তত জানি ফল কি হবে।
ধান লাগিয়ে কেউ সেই ক্ষেত থেকে গম তুলেছে বলে কখনো শুনিনি!আমার রেজাল্টও তাই হবে।
রেজাল্ট দেয়ার দিন সকালবেলা; আমাকে অফিসে ডেকে নেয়া হলো।
কি অপমান আছে কপালে জানি না।আমাদের স্কুলে বিশাল অডিটোরিয়াম আছে।কেউ অপরাধ করলে বা পরিক্ষায় ফেল করলে তাকে অডিটোরিয়ামের বিশাল স্টেজে ওঠানো হয়।তারপর সব লাল বাতি জ্বালিয়ে কানে ধরে ওঠবস করানো হয়।সেই নাটক মঞ্চস্থ হয় ত্রিশ জন শিক্ষক,দশ-বারো জন দপ্তরী আর দুই হাজার ছাত্রছাত্রীর সামনে!
তবে আশার কথা আমি এখন অডিটোরিয়াম হলে না;দাঁড়িয়ে আছি হেড স্যারের সামনে।
ইংরেজি ম্যাডামও আমার পাশে অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।দেখে মনে হচ্ছে হেড স্যার তাকেও আজ মারবে।একটু একটু হাসি পাচ্ছে আমার,কিন্তু ভয়ে হাসতে পারছি না।
হেড স্যারে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থেকে টেনে টেনে প্রথম প্রশ্ন করলেন,"বাবা তুমি কষ্ট করে প্রথম হয়েছ।আমি তোমাকে কী উপহার দেবো?"
আমি চুপ করে রইলাম।কারন ফেল করে প্রথম হওয়ার উপহার কি হতে পারে তা আমি জানি না।
"তোমার ম্যাডামেরও একটা উপহার পাওনা রয়েছে।দুজনকে এক সাথে উপহার দিলে কেমন হয়?"-স্যার আবার জিজ্ঞেস করলেন।
না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম স্যার আমার দিকে বাঘের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
"ঠিক আছে যাও বাবা;আমি দেখছি তোমাদের কী উপহার দেয়া যায়।"-এই বলে চলে যেতে বললেন।
আমি ভয়ে অস্থির হয়ে গেলাম।খাসি মেরে তো আর বিরিয়ানি খাওয়াবে না!উপহার যে কঠিন কিছু হবে তাতে আর সন্দেহ নেই।আমি নিশ্চিত কপালে আজ অডিটোরিয়ামের লাল বাত্তি জ্বলবে!
বারান্দায় এসেছি এমন সময় শুনতে পেলাম হেড স্যার ম্যাডামের উপড় চড়াও হচ্ছেন,"ঘোড়ার ডিম পড়ান,ঘাস কাটেন সারাদিন,মশা মারেন ক্লাসে।ফেল-এরও একটা মানইজ্জত আছে।সাতাশ পেয়ে প্রথম হয়েছে হারামজাদা।আপনার চাকরি তো গেছেই,সাথে আমারটাও খেয়েছেন।"
তারপর আর কিছুই শুনতে পেলাম না।ক্লাসে এসে চুপ করে বসে রইলাম।হেড স্যার মনে হয় এখনো ম্যাডামের সাথে হালুম হালুম করছে।
এক ভয় কাটতে না কাটতেই আরেক ভয় মনের মধ্যে বাসা বাধতে শুরু করেছে।আমি ম্যাডামকে চিনি,তিনি ক্লাসে এসে যে গগনবিদারী চিৎকার দেবেন তাতেই আমার এখন প্যারাসিটামল খেতে ইচ্ছা করছে!
আমি জানালার ফাক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছি;ম্যাডামের হাতে কোন বেত আছে কি-না।নাহ নেই।
তারপরেও কেন জানি ভয় আরো বাড়ছে।
বেত যখন নেই তাহলে আজ নিশ্চিত ক্লাসের সবার জন্য টিসি নিয়ে আসছেন।
ম্যাডাম ক্লাসে প্রবেশ করলেন,"বাবা,কী খবর তোমার?"-এই কথা বলে আমার গালে চিমটি কাটলেন।কি যে আদর করলেন তা আর বলে বোঝানোর দরকার নেই।মনে হলো আমি কিন্ডারগার্টেনে পড়ি।
এরপর শুরু করলেন বেধড়ক মার।বেত ক্লাসেই ছিল-আমি খেয়াল করিনি।তিনি ঘুরে ঘুরে শুধু আমাকেই মারলেন।হয়রান হয়ে গেলে জিরিয়ে জিরিয়ে মারলেন।
"তুই ফেল করলি কেন?"-এই কথা বলে আর গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হয়।ক্লাসের আর কেউ সেদিন মার খায়নি,আমি একাই সবার মার খেয়েছি।
রাগে দুঃখে লজ্জায় সেদিন টিফিন পর্যন্ত খেতে পারিনি।
এখনো মনে;আছে আমি তিন চারদিন গোসল করিনি-এই ভয়ে যদি কেউ মারের দাগ দেখে ফেলে!
দুইঃ
অপ্রিয় সত্য বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই।সত্য যদি কারো কাছে অপ্রিয় মনে হয় তবে সে অপরাধী।কিন্তু কি করবো; মিথ্যা শুনতে শুনতে কান এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে,একসাথে অনেক সত্য শুনলে আমাদের কান বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে।তখন সত্যকে মিথ্যা বলেই মনে হয়।
লাল মিয়া মাটি কেটে সংসার চালায়।রোজকার মতো আজকেও সে ফজরের আজানের সাথে সাথেই বিছানা ছেড়েছে।হাত মুখ ধুয়ে কোদাল হাতে আধো অন্ধকারে হেটে রওয়ানা হয়ে গেছে নদীর পাড়ের দিকে।লাল মিয়ার বাড়ী থেকে জায়গাটা খুব বেশি দূরে না।আজ নদীর পাড়ে মাটি কাটবে দুপুর বারোটা পর্যন্ত।আরো তিনজন আগেই সেখানে উপস্থিত হয়ে গেছে।
মাটি কাটা শুরু করার আগে তাদের রোজকার অভ্যাস বিড়ি ফুঁকা,আজকেও ফুঁকছে।
বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে লাল মিয়া আলী মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,"বুঝলা আলী বাই,আইজ-কাইল শইলডা বেশি ভালা যায় না।কাম করতে মনে চায় না।"
"কি আর করবা বাই,"আলী মিয়া বলে।
"আমাগো কাম মরার আগে আর শ্যাষ হইবো না।তোমার ব্যাটা পুত্তুর নাই,কাম কইরাই খাইতে হইবো।"
এই কথাটা শোনার পর লাল মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
তারা কাজ করে আর নিজেদের নানান ঘটনা নিয়ে আলোচনা করে।দুঃখের ঘটনা,হাসির ঘটনা,মজার ঘটনা।এভাবেই দিন কেটে যায় তাদের।
মাটি কাটা চারজনের দলে আনিস বয়সে সবার ছোট।ওর আগ্রহ এবং ভয় দুটোই খুব বেশি।মাটি কাটতে কাটতে ও একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে।সবাইকে ডেকে সেই জিনিসটা এখন দেখাচ্ছে।
আমি ইদানীং এই সময় স্কুলে যাই,আজকেও যাচ্ছি।
আমার ভাগ্য ভালো স্কুল থেকে টিসি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়নি।
সামনে ভাল রেজাল্ট করবো-এই প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর মাফ করে দিয়েছে।প্রাইভেট টিচারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে আমার জন্য।তাই সকাল ছয়টার দিকে আমি সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছি নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে।এমন সময় আলী ভাইদের উৎসাহী কথাবার্তা শুনে সাইকেল থামালাম।
আবিষ্কৃত জিনিসটি একটা কাফনের কাপড়।আনিস বেশ ভয় পেয়েছে কাফনের কাপড় দেখে।ভয়ের আসল কারন কাপড়টা নতুন!
আলী আর লাল মিয়া দুজনেই বয়স্ক,তারা নানান জিনিস দেখে অভ্যস্ত।মাটি থেকে অনেক কিছুই বেরোয় -এতে ভয়ের কিছু নেই।তাদের জীবনে তারা এরকম বহুবার দেখেছে।
কিন্তু নির্ভীক আলী মিয়াও আজ ভয় পেয়েছে-দারুন ভয়!
অতি উৎসাহী আনিস কাপড় টানতেই বেড়িয়ে এসেছে ছোট্ট তুলতুলে একটা হাত!পুরোটা টানতেই বেড়িয়ে এসেছে সদ্যজাত বাচ্চার লাশ!ফুটফুটে একটা বাচ্চা,বেশিক্ষণ হয়নি দাফন করা হয়েছে।
সত্যি বলতে দাফন বা কবর কোনটাই করা হয়নি-স্রেফ পুতে রাখা হয়েছে।কিন্তু এখানে কেন?এই নদীর পাড়ে!এটা তো কবরস্থানও না!
সবাই মিলে তাড়াতাড়ি আবার বাচ্চাটাকে মাটি চাপা দিয়ে রেখে চলে যাচ্ছে।এতোটুকুই যথেষ্ট,আর ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছা কারো নেই।আমাকে দেখে আলী ভাই বলল,"শিগগির পলা ছোট ভাই।এইহানে থাকার দরকার নাই,স্কুলে যা তাড়াতাড়ি।"
অন্যদের বলল,"আইজ আর কামের দরকার নাই।বেবাকে বাড়ী যাও।"
আনিসও তাড়া দিল,"তাড়াতাড়ি ভাগো চাচা।আগে জানবার পারলে এই পাড়ে পাও দিতাম না-কি কোন কালে।জন্মের তরে তওবা কাটলাম;মাটি কাটা কাম আর না।"
কিন্তু লাল মিয়ার নড়বার লক্ষণ নেই।সে ভয় পায়নি,অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছোট্ট গর্তটার দিকে।এতোটুকু বাচ্চা কার এমন ক্ষতি করেছে যে কবরেও জায়গা হলো না!
লাল মিয়া নিঃসন্তান।কতো কেঁদেছে একটা বাচ্চার জন্য অথচ এই বাচ্চাটা মানুষের কাছে বেশি হয়ে গেলো!
বাচ্চাটার পরিচয় পর্যন্ত জানতে পারবে না কেউ।জানার অবস্থায় থাকলে কবরস্থানেই ওর তুলতুলে দেহটার জায়গা হতো।এটাই সত্য কথা।
চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো লাল মিয়া আর তার দল।
বাচ্চাটা একা পড়ে রইলো নদীর পাড়ে, সবার পিছনে-অচেনা এক জগতে।ওটাই ওর ঘর-ওটাই ওর বিছানা।
আমি একা একা ভাবছি;ঐ ছোট্ট অন্ধকার গর্তে কীভাবে থাকবে ফুটফুটে শিশুটা,কিভাবে বইবে এতো মাটির ভার;ওর ঐ ছোট্ট দেহটি।ভাবতে ভাবতে সবার মতো আমিও চলে যাচ্ছি।সাইকেলের পেডালে চাপ বাড়ালাম।সামনের রাস্তা কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে-কিন্তু এখন শীতকাল না।লাল মিয়ার মতো আমার চোখেও পানি জমতে শুরু করেছে মনে হয়।
দীর্ঘ দিন পর লিখতে বসা আজ আমি আর সেই ছোট্টটি নেই,অনার্স কমপ্লিট করেছি।অনেক বড় হয়ে গেছি কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনা ভুলতে পারিনি।এই ঘটনা থেকে আমি শিখেছি;সমাজ নিজেই একটা নিস্তব্ধ কবর।আরো শিখেছি শুধু খাতার পাতায়ই ফুলস্টপ হয় না,এই অন্ধকার সমাজের প্রতিটা বাকে বাকে কারো না কারো জন্য অপেক্ষা করছে ফুলস্টপ!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন